চলতি মৌসুমে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের টার্গেট মাথায় নিয়ে মাঠে নেমেছেন কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের হাজারো চাষি। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে সর্ব প্রথম লবণ উৎপাদনে মাঠে নামেন কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলার চাষিরা।
গত ৪ নভেম্বর কুতুবদিয়ায় লবণের প্রথম চালান উত্তোলন করা হয়। এছাড়া নভেম্বর মাসের শুরুতেই লবণ উৎপাদনে মাঠে নেমেছেন চকরিয়া, পেকুয়া ও টেকনাফ উপজেলার চাষিরা। একই সাথে চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও পটিয়ায় লবণ উৎপাদন শুরু হয়।
বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ২৪০ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। এখন সব খরচ বাদ দিয়ে মণ প্রতি লবণের দাম চলছে ৩৩৫-৩৪০ টাকা। চাহিদার তুলনায় বেশি লবণ মজুদ থাকায় এবার লবণের দাম কিছুটা কম রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে চাষিরা মণ প্রতি লবণের দাম পাচ্ছেন সর্বোচ্ছ ২০০ টাকা।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত চলতি মৌসুমের পাঁচ মাসে কক্সবাজারের টেকনাফ, সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, ঈদগাঁও, চট্টগ্রামের পটিয়া ও বাঁশখালীতে ৬৯ হাজার একর জমিতে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত বছর ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ উৎপাদিত হয়েছিল ২৪ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন, যা বাণিজ্যিক লবণ উৎপাদন শুরুর পরবর্তী ৬২ বছরের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এবার তাপমাত্রা বেশি এবং ঝড় বৃষ্টি না হলে লবণ উৎপাদন ২৬ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। দেশে লবণের বার্ষিক চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ২৫ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। লবণ মজুদ রয়েছে ৪ লাখ মেট্রিক টন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, লবণ উৎপাদনে মাঠে পুরোদমে কাজ করছেন চাষিরা। হাজার হাজার একর জমি লবণ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করছেন তারা।

চাষিরা জানান, মাঠে নেমে গেছেন জেলার অধিকাংশ চাষি। মহেশখালী ও সদরের কিছু জায়গায় মাছের প্রজেক্টে পানি থেকে যাওয়ায় সেখানে কাজ শুরু হয়নি। তবে আগামী সপ্তাহের মধ্যে জেলার সব মাঠে পুরোদমে লবণ উৎপাদনে যাবেন চাষিরা। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লবণ উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবেন বলে আশা চাষিদের।
চাষিরা আরও জানান, গত বছর প্রতি মণ লবণ বিক্রি হয়েছে ৪০০ টাকায়। এবার সেই দাম অনেক কমে এসেছে। ব্যবসায়ীরা মাঠ পর্যায় থেকে সর্বোচ্ছ মণ প্রতি লবণ ২০০ টাকার বেশি দাম দিচ্ছে না। অভাবের তাড়নায় অনেকে লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করছেন। অথচ প্রতি মণ লবণ বিক্রির বিপরীতে চাষিদের খরচ হয় ২০০ টাকার বেশি।
লবণ চাষি মনিরুল ইসলাম বলেন, এই বছর লবণের দাম অনেক কম। মাঠ থেকে শুধু মজুরি খরচ তুলতে পারবো কিনা সন্দেহ হচ্ছে। প্রতি বছরই দুশ্চিন্তা ও ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামতে হয় আমাদের। কতিপয় কিছু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা লবণ উৎপাদনের শুরুতে দাম কমিয়ে দিয়ে চাষিদের লবণ উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করছেন। যাতে লবণ সংকট দেখিয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা যায়। লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করতে হচ্ছে দেখে বহু চাষি জমির পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। তাতে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কুতুবদিয়া উপজেলার লবণ চাষি আহমেদ মিয়া বলেন, গত বছর লবণ উৎপাদনের শুরুতে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হয়েছিল ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা। এবার বেশি লাভের আশায় চাষিরা আগেভাগে মাঠে নেমে লবণ উৎপাদন শুরু করেন। কিন্তু লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করার কারণে চাষিরা মারাত্মকভাবে হতাশ হয়েছেন। মাঠে প্রতি কেজি লবণের দাম ৫ টাকা হলেও বাজারে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত লবণ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৬০ টাকায়। মাঠ থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত লবণের দামের এত তারতম্য কেন, তা তদারকি কিংবা অনুসন্ধানের জন্যে কেউ নেই।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সুত্র বলছে , গত বছর ৬৮ হাজার একরের বেশি জমিতে আধুনিক পলিথিন প্রযুক্তি পদ্ধতি ব্যবহার করে লবণ উৎপাদন হয়েছে। এবারও শতভাগ জমিতে পলিথিন প্রযুক্তিতে লবণ উৎপাদিত হবে। এ বিষয়ে চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সনাতন পদ্ধতির তুলনায় পলিথিন প্রযুক্তিতে লবণ উৎপাদন আড়াই গুণ বেশি হয়। জেলার ৪৪ হাজার প্রান্তিক চাষি, ১ লাখ শ্রমিকসহ অন্তত ১০ লাখ মানুষ লবণ উৎপাদন, বিপণন, পরিবহন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
জেলা লবণ চাষি সমিতির নেতৃবৃন্দ বলছেন, মৌসুম শুরুর মুহূর্তে লবণের দাম কমে যাওয়ায় চাষিরা হতাশায় ভুগছেন। আর্থিক লোকসানের কারণে চাষের পরিমাণ কমে গেলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তাই লবণের দাম কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। পাশাপাশি চাষিদের ঠকিয়ে সেসব ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৈরি করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভুঁইয়া বলেন, চলতি মৌসুমে প্রথম লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে কুতুবদিয়ায়। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে মৌসুম শুরুর অন্তত ২০ দিন আগে কুতুবদিয়ায় চাষিরা মাঠে নেমেছেন । এরপর পেকুয়া, চকরিয়া, টেকনাফ এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও পটিয়া । এখন ২০ শতাংশ জমিতে লবণ উৎপাদিত হচ্ছে। আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে অবশিষ্ট ৮০ শতাংশ জমিতে পুরোদমে লবণ উৎপাদন শুরু হবে। চলবে টানা পাঁচ মাস। তাপমাত্রা ভালো থাকলে লবণের বাম্পার উৎপাদন হতে পারে। মৌসুমে দৈনিক ৪৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের রেকর্ড ছিল গত বছর মার্চে। তবে একবার বৃষ্টি হলে টানা পাঁচ থেকে সাত দিন লবণ উৎপাদন বন্ধ থাকে।

