ট্রাম্পের সঙ্গে বিতণ্ডা, বৈঠকস্থল ত্যাগ জেলেনস্কির

হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠক

0
84
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠক হলেও সেটি ছিল খুব উত্তপ্ত। বলা যায়, বৈঠকজুড়েই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নাস্তানাবুদ হয়েছেন। বৈঠকের এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভলোদিমির জেলেনস্কি তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় ট্রাম্প বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তি করুন, না হয় আমরা এর মধ্যে নেই।’ ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর জেলেনস্কি হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস থেকে বেরিয়ে যান। বাতিল করা হয় যৌথ সংবাদ সম্মেলন।

সংবাদদাতারা বলছেন, দু্ই প্রেসিডেন্টের মধ্যকার এই বিতণ্ডা নজিরবিহীন।

গতকাল শুক্রবার ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসে ট্রাম্প-জেলেনস্কির ওই বৈঠকে জেলেনস্কি ট্রাম্পকে বলেছেন, ‘শান্তিচুক্তির আলোচনায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কোনো আপস নয়।’

সংবাদদাতারা বলছেন, ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে বলেছেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) এবং জেলেনস্কি যদি রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে পারেন, তা হলে সেটি একটি বড় ধরনের কাজ হবে।’ তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে কিছু ছাড় দেওয়র জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে কিয়েভকে।’

বৈঠকে জেলেনস্কি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধে নিষ্ঠুরতার নানা চিত্র দেখান। বলেন, তার প্রত্যাশা ট্রাম্প ইউক্রেনের সঙ্গেই থাকবেন।

ওভাল অফিসে ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠকের খবর সংগ্রহের জন্য সেখানে ছিলেন বিবিসির সাংবাদিক মিরোস্লাভা পেটসা। তিনি ট্রাম্প ও জেলেনস্কির কথোপকথনের একটি ভিডিও পাঠিয়েছেন।

শান্তিচুক্তি না হলে আপনি কি ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠাবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে সেই ভিডিওতে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা বড় ধরনের অস্ত্রশস্ত্র পাঠানোর কথা ভাবছি না। আমরা যুদ্ধ শেষ করার কথা ভাবছি।’ তিনি বলেন, “এ প্রশ্নের উত্তর হতে পারে ‘হ্যাঁ’। তবে আশা করি, আমরা ইউক্রেনে আর বেশি অস্ত্রশস্ত্র পাঠাব না। কারণ আমরা যুদ্ধটা দ্রুত শেষ করতে চাই।”

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পাদিত খনিজ চুক্তির প্রশংসা করেন। বলেন, ‘ওই সব খনিজ পদার্থের বড় প্রয়োজন আমাদের।’
সংবাদদাতারা বলছেন, ওই আলোচনায় রুদ্ধদ্বার কক্ষে অংশ নেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জেডি ভান্স জেলেনস্কির বিরুদ্ধে অভদ্রতার অভিযোগ আনেন। এ সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি (জেলেনস্কি) তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলছেন।’

বৈঠকে দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বেশ উত্তেজিত কথাবার্তা হয়। জেলেনস্কি বলেন, ‘আসলে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২০১৪ সালে। ২০১৯ সালে আমি যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে সই করেছিলাম। পুতিন প্রতিশ্রতি দিয়েছিলেন চুক্তি মেনে চলার। কিন্তু পুতিন তার প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন ২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরুর মধ্য দিয়ে। এটা কোন ধরনের কূটনীতি?’ এ সময় তিনি জেডি ভান্সকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘আপনি কি এ ব্যাপারে কিছু বলবেন?’ এ সময় ভান্স বলেন, ‘ওভাল অফিসে আসাটাই আপনার জন্য অসম্মানের। কারণ আপনি বিষয়টি নিয়ে আমাদের মিডিয়ায় কথা বলে এর যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করবেন।’

বৈঠকে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেই বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য ইউরোপ এবং ন্যাটোকেই বেশি করে ভাবতে হবে।’ এ সময় জেলেনস্কি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির তাৎপর্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেও ভাবতে হবে।’

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হতে বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই এটি হোয়াইট হাউসে তৃতীয় রাষ্ট্রপ্রধানের সফর। তাই আনুষ্ঠানিকতার পর্বও ছিল যথারীতি।

বিবিসি জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসে প্রথা অনুযায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি করমর্দন করেন। পরে তারা হোয়াইট হাউসের পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত সাংবাদিকদের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে ছবি তোলার সুযোগ দেন।

তবে দুজনের হ্যান্ডশেককে একটি সংক্ষিপ্ত করমর্দন হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিবিসির সাংবাদিক। অন্তত সপ্তাহের শুরুতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে করা করমর্দনের তুলনায়।

করমর্দনের পর তারা একসঙ্গে ওভাল অফিসের দিকে রওনা হন। সেখানেই তাদের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। এর আগে একটি কালো এসইউভি থেকে বের হয়ে হোয়াইট হাউসের পশ্চিম প্রবেশপথ দিয়ে পা রাখেন জেলেনস্কি। সেখানেই তাকে অভ্যর্থনা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের জন্য গার্ড অব অনার প্রস্তুত ছিল। সেনাদের হাতে ছিল ৫৮টি পতাকা। এর মধ্যে ৫৬টি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলের পতাকা, পাশাপাশি আমেরিকা ও ইউক্রেনের জাতীয় পতাকা। এই অভ্যর্থনা পর্ব এখন হোয়াইট হাউসে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও একই আনুষ্ঠানিকতা উপভোগ করেছেন।

জেলেনস্কির আগে গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। ওই বৈঠকের পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার আলোচনায় সুর নরম করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে ইউরোপ মরিয়াভাবে যা চাইছে, যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ইউক্রেনের সেই নিরাপত্তা দেওয়া নিয়ে কোনো দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকার করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, তিনি (পুতিন) প্রতিশ্রুতি রাখবেন। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। দীর্ঘদিন ধরেই আমি তাকে চিনি। আমি বিশ্বাস করি না যে তিনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন।’

সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার অবস্থানের দিকে ঝুঁকেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করার পাশাপাশি তিনি সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির। সর্বশেষ জাতিসংঘে ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর এক প্রস্তাবে রাশিয়ার নিন্দা জানাতেও অস্বীকৃতি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের এ অবস্থানে উদ্বিগ্ন যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলো। কিয়ার স্টারমার হলেন দ্বিতীয় নেতা, যিনি ইউক্রেন ইস্যুতে অনেকটাই শূন্য হাতে ওয়াশিংটন থেকে ফিরছেন। গত সোমবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ইউক্রেনের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি আদায়ে ট্রাম্পকে বশে আনার চেষ্টা করেন। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস পাননি তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here