যুক্তরাষ্ট্রে শনিবার থেকে সব ধরনের আমদানির ওপর ১০ শতাংশ হারে শুল্ক কার্যকর হয়েছে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা শুরুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকানদের কঠিন সময় পার করতে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ শতাধিক দেশে এই শুল্কের সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী চীন জানিয়েছে, তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের প্রধান তিনটি স্টক সূচকেরই ৫ শতাংশের বেশি পতন হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে—যা ২০২০ সালের পর থেকে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক ধস।
ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। ট্রাম্প বর্তমান বাজারের এই অস্থিরতাকে ‘অর্থনৈতিক বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হবে বলে তিনি দাবি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, শক্ত হোন, এটা সহজ নয়। তবে শেষটা ঐতিহাসিক হবে।
ট্রাম্পের এই শুল্কনীতি ঘোষণার পরপরই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যে এফটিএসই ১০০ সূচক প্রায় ৫ শতাংশ কমে গেছে— যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। এশীয় বাজারগুলোতেও পতন দেখা গেছে। জার্মানি ও ফ্রান্সের বাজারেও একই ধরনের ধস নেমেছে।
এদিকে যিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সির (ডিওজিই) দায়িত্বে থাকা বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ‘শূন্য শুল্কের’ পথে যেতে পারে। যা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ইতালির মন্ত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন।
এর কয়েকদিন পর, আগামী ৯ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ঘাটতিতে ‘সবচেয়ে খারাপ অবস্থা’ রয়েছে—এমন দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (টিটিআইপি) প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ২০১৮ সালে ইউরোপীয় গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি থেকে সরে আসার মাধ্যমে একটি সম্ভাব্য বাণিজ্য যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কেয়ার স্টারমার ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণা পর বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে একাধিক টেলিফোনে আলোচনা করেছেন। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে এক আলোচনায় তারা একমত হয়েছেন যে, বাণিজ্য যুদ্ধ কারও স্বার্থে নয়, তবে সম্ভাব্য সব বিকল্প খোলা রাখা উচিত। তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ট্রাম্পের শুল্ক আরোপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের নাম চীন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশ শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৩৪ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছে—যেটা যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর আরোপ করেছে তার সমান।
চীন এই নতুন শুল্কের বিরুদ্ধে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) একটি অভিযোগও দায়ের করেছে। পরদিন এক বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যেন চীনের অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে শুল্ক ব্যবহার বন্ধ করে এবং চীনা জনগণের বৈধ উন্নয়ন অধিকারকে বাধাগ্রস্ত না করে।
শনিবার ওয়াশিংটন ডিসি সহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ১২শ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হওয়া কথা—যা হোয়াইট হাউসের নতুন নীতিমালার বিরুদ্ধে ট্রাম্প ও মাস্কের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় একদিনের প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস এখনো এই বিক্ষোভ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে একজন এপি ফটোগ্রাফারের তোলা ছবিতে ট্রাম্পকে নিউইয়র্ক পোস্ট পত্রিকার একটি সংখ্যার সঙ্গে দেখা গেছে, যেখানে চীন সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন খোলা ছিল।
এই নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর থেকেই বাণিজ্যের উপর প্রভাব স্পষ্ট।

