গাজায় বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সতর্কতা

0
53

গাজায় বিমান থেকে ত্রাণ ফেলাকে ‘অদ্ভুত বিভ্রান্তি’ বলে সতর্ক করেছেন ত্রাণ সংস্থাগুলোর নেতারা। এই ব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান অনাহারের সংকট নিরসনে কোনও ভাবেই কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেছেন তারা। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী রবিবার (২৭ জুলাই) সকালে জানিয়েছে, তারা গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা বিমান থেকে ফেলেছে। তাদের এমন দাবির প্রতিক্রিয়ায় এ সতর্কবার্তা দিলেন ত্রাণ সংস্থাগুলোর নেতারা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং জর্ডান আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার পরিকল্পনা করেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার বলেছেন, গাজায় বিমানপথে ত্রাণ পাঠাতে ব্রিটিশ সরকার ‘যা কিছু সম্ভব, সব করছে।’

তবে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) কিয়ারান ডনেলি বলেছেন, বিমান থেকে ত্রাণ ফেলা ‘প্রয়োজনীয় পরিমাণ বা গুণগত মানের ত্রাণ সরবরাহ করতে পারে না।’

শতাধিক আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠন সতর্ক করেছে যে, গাজায় ব্যাপক অনাহার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার বিষয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে মূলত স্থলপথে ত্রাণ প্রবেশ ব্যর্থ হওয়ার কারণে।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার প্রধান ফিলিপ লাজারিনি শনিবার বলেছেন, বিমান থেকে ত্রাণ ফেলা ‘ব্যয়বহুল, অকার্যকর এবং কখনও কখনও ভুল হলে না খেয়ে থাকা বেসামরিক মানুষদের মেরে ফেলতেও পার।’

তিনি জানান, তার সংস্থার হাতে জর্ডান ও মিসরে প্রায় ৬ হাজার ট্রাকের সমপরিমাণ ত্রাণ মজুদ আছে। কেবল সবুজসংকেত পেলেই তা গাজায় প্রবেশ করানো সম্ভব।

লাজারিনি বলেন, ‘অবরোধ তুলে নেওয়া, পথ খুলে দেওয়া এবং নিরাপদ চলাচল ও মর্যাদাপূর্ণ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থলপথে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ, কার্যকর, দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। এটি গাজার মানুষের জন্য বেশি মর্যাদাপূর্ণ।’

এর পরপরই ইসরায়েল ঘোষণা দেয় যে তারা ‘নির্ধারিত মানবিক করিডোর স্থাপন করবে, যাতে জাতিসংঘের ত্রাণ বহর নিরাপদে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ করতে পারে।’ তবে এসব করিডোর কোথায় হবে বা কীভাবে কাজ করবে সে সম্পর্কে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

ইসরায়েল দাবি করেছে, গাজায় ত্রাণ প্রবেশে তারা কোনও বাধা দিচ্ছে না। সরকারের এক মুখপাত্র এর আগে অভিযোগ করেছিলেন, জাতিসংঘ হামাসের সঙ্গে কাজ করছে এবং ত্রাণ বিতরণে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। জাতিসংঘ ও হামাস উভয়ই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

এটাই প্রথম নয় যে পশ্চিমা এবং আরব সরকারগুলো গাজায় আকাশপথে ত্রাণ পাঠানোর চেষ্টা করছে।

গত বছর, ব্রিটেনের রয়্যাল এয়ার ফোর্স জর্ডানের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক বিমান বাহিনীর অংশ হিসেবে ১০টি বিমান ফেলে ১১০ টন ত্রাণ সরবরাহ করেছিল।

তবে ত্রাণ সংস্থাগুলো বলেছে, এই পরিমাণ ত্রাণ গাজায় চলমান দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি কমাতে খুবই অপ্রতুল।

বিবিসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য একবেলার খাবার সরবরাহ করতে প্রায় ১৬০টি বিমানের প্রয়োজন পড়ে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কার্গো বিমানগুলো প্রতি ট্রিপে গড়ে প্রায় ১২ হাজার ৬৫০টি খাবার সরবরাহ করেছিল। অথচ জর্ডানের কাছে প্রায় ১০টি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রয়েছে আরও ৮টি কার্গো বিমান।

একাধিক ত্রাণ সংস্থা সতর্ক করেছে যে হাজার হাজার টন খাবার ঘনবসতিপূর্ণ গাজায় আকাশ থেকে ফেলা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের শায়না লো বলেন, মানুষ ডুবে যাচ্ছে যখন তারা ভূমধ্যসাগরে উড়ে যাওয়া ত্রাণ সংগ্রহের চেষ্টা করছে এবং আকাশ থেকে পড়া বাক্সগুলো মানুষকে চাপা দিয়েছে।

তিনি বলেন, এমনকি যখন ত্রাণ সফলভাবে পড়েছে, তখনও এটা ছিল বিশৃঙ্খল। “মানুষ ত্রাণ নিয়ে মারামারি করছে। আহত হচ্ছে।

গাজায় এই ধরনের ত্রাণ ফেলা নিয়ে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে। শনিবার বিবিসি বেশ কয়েকজন গাজাবাসীর সঙ্গে কথা বলেছে যারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে ত্রাণ সরবরাহ গুরুতর ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

এদিকে গাজায় মানুষ অপুষ্টির পাশাপাশি পানিশূন্যতার সঙ্গেও লড়াই করছে। এক মা বিবিসিকে বলেন, তারা কোনও খাবার বা পানি ছাড়াই বেঁচে আছেন, না খাবার, না রুটি। এমনকি পানি পর্যন্ত নেই।

ইসরায়েল মার্চের শুরুতে গাজায় সমস্ত ত্রাণ প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করে এবং দুই মাসব্যাপী যুদ্ধবিরতি ভেঙে হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করে। ইসরায়েল জানায়, তাদের উদ্দেশ্য হলো হামাসকে বাকি ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া।

প্রায় দুই মাস পর বিশ্বজুড়ে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা নিয়ে সতর্কতা দেওয়ার প্রেক্ষিতে অবরোধ কিছুটা শিথিল করা হলেও খাদ্য, ওষুধ এবং জ্বালানির সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here