বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন রাজনীতির প্রতীক বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ মহাযাত্রার মহাসমাপ্তি ঘটল। জীবনভর যিনি দৃঢ়তা ও প্রতিজ্ঞার প্রতিচ্ছবি ছিলেন, মৃত্যুতেও তিনি নিজের কথার অটল সাক্ষ্য রেখে গেলেন।
জন্মভূমির প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার যে ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন—এই দেশ ছেড়ে কোথাও যাবেন না—রাজনৈতিক জেল-জুলুম থেকে বাঁচতে বারবার সুযোগ আসলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে লাল-সবুজের পতাকার সার্বভৌমত্ব বুকে ধারণ করে বাংলাদেশের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং এই মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে আপসহীনতার প্রতীক হয়ে ওঠা এই নেত্রী প্রমাণ করে গেলেন যে প্রতিজ্ঞা কেবল কথায় নয়, জীবনের শেষ মুহূর্তেও ধারণ করা যায়। লাখো নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীর চোখের জলে ভাসিয়ে তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করলেও রয়ে গেলেন কোটি মানুষের হৃদয়ের গভীরে। রাজপথের আন্দোলন, সংসদের বিতর্ক, কারাবন্দিত্ব এবং অসুস্থতাসহ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তিনি পরিণত হয়েছেন এক অনন্ত ইতিহাসে।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুর ৩টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে খতিবের ইমামতিতে তার জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত জানাজায় মানুষের ঢলই বলে দেয়, জনমানুষের বুকে বেগম খালেদা জিয়া কতটা গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন। নীরব সেই জনস্রোত যেন শব্দহীন ভাষায় বিদায় জানিয়েছে একজন রাজনীতিক নয়, এক যুগের প্রতিনিধিকে।
জানাজা শেষে রাষ্ট্র, দল ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত শ্রদ্ধায় মুখরিত পুরো প্রাঙ্গণ। এরপর তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তিন বাহিনীর সদস্যদের কাঁধে করে জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। সেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে বড় পুত্র তারেক রহমান নিজ হাতে তার মা বেগম খালেদা জিয়াকে শায়িত করেন।
দাফনের পর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা গার্ড অব অনার প্রদান করেন। বন্দুকের নীরব সালাম, পতাকার ভাঁজ এবং স্তব্ধ আকাশ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র যেন শেষবারের মতো তার এক সাবেক সরকারপ্রধানকে শ্রদ্ধা জানাল। মাটির নিচে ঘুমিয়ে পড়লেও বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে, মানুষের স্মৃতিতে, এবং আপসহীনতার এক অনন্য প্রতীকে চিরকাল রয়ে গেলেন।