ইরানে তীব্র বিক্ষোভ: খামেনির অনড় অবস্থান, ইন্টারনেট বন্ধ করে দমনের চেষ্টা

0
47

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া প্রায় দুই সপ্তাহের চলমান বিক্ষোভের মুখে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান পিছু হটবে না। এই অস্থিরতার মাঝে সরকার বিক্ষোভ দমনে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে।

দেশটির ৩১টি প্রদেশের শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ বিক্ষোভ থেকে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সরকারি ভবন ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে অগ্নিসংযোগ করেছেন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু’ এবং ‘খামেনির মৃত্যু’ চাইসহ বিভিন্ন সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা যায়। বৃহস্পতিবার রাতভর দেশটির বড় বড় সব শহরে হাজার হাজার মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।

ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পুরোপুরি ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। শুক্রবার ভোরের দিকে সংস্থাটি জানায়, ব্যাপক বিক্ষোভ দমনের চেষ্টায় দেশটি ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অফলাইনে রয়েছে। এই বিক্ষোভকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাড়ে চার দশকের ইতিহাসে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যেই ধর্মতান্ত্রিক শাসনের অবসান দাবি জানাচ্ছেন।

গত ৩ জানুয়ারি থেকে ক্রমবর্ধমান এই বিক্ষোভ নিয়ে করা প্রথম মন্তব্যে খামেনি নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বিক্ষোভকারীদের “ধ্বংসকারী” ও “নাশকতাকারী” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। খামেনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “সবাই জানেন, শত সহস্র সম্মানিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে; নাশকতাকারীদের সামনে তারা পিছু হটবে না।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে “এক হাজারের বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত” আখ্যা দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, অহংকারী মার্কিন নেতা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ইরান শাসনকারী সাম্রাজ্যবাদী রাজবংশের মতোই “উৎখাত” হবেন।

এদিকে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি শাসনব্যবস্থা উৎখাতে “অবিশ্বাস্য উদ্দীপনা” দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। ইরানের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, “ইরানি কর্তৃপক্ষ যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তাহলে আমরা তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করব। আমরা প্রস্তুত।”

বিক্ষোভের একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তেহরানের আয়াতুল্লাহ কাশানি বুলেভার্ডে জনতার ব্যাপক ভিড় এবং বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে গাড়ির হর্ন বাজানো হচ্ছে। এ সময় “স্বৈরাচারের মৃত্যু” স্লোগান দিতে শোনা যায়, যা ১৯৮৯ সাল থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র শাসনকারী ৮৬ বছর বয়সী খামেনিকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া। অন্যান্য ভিডিওতে দেশের উত্তরাঞ্চলের তাবরিজ, পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শহর মাশহাদ এবং কুর্দি অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চলের আঞ্চলিক কেন্দ্র কেরমানশাহ-সহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ দেখা গেছে। কয়েকটি ভিডিওতে কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রবেশপথে এবং মারকাজি প্রদেশের রাজধানী শাজান্দে গভর্নরের ভবনেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যদিও ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি তাৎক্ষণিকভাবে এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, বৃহস্পতিবার গভীর রাতের এই বিক্ষোভ ২০২২-২০২৩ সালে দেশজুড়ে হওয়া আন্দোলনের পর ইরানে সবচেয়ে বড়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কঠোর পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় তিন বছর আগে ওই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ, চলমান বিক্ষোভে কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে এবং এতে অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। তবে তেহরান থেকে পাওয়া সর্বশেষ ভিডিওতে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি দমনপীড়ন চালাতে দেখা যায়নি।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে উৎখাত হওয়া ইরানের শাহর ছেলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রেজা পাহলভি বৃহস্পতিবার বড় বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং শুক্রবার রাস্তায় নতুন করে শক্তি প্রদর্শনেরও আহ্বান জানান। শুক্রবার ভোরে নতুন এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, বৃহস্পতিবারের সমাবেশ দেখিয়েছে কীভাবে একটি বিশাল জনসমাগম দমনকারী শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করে। তিনি শুক্রবার আরও বড় বিক্ষোভের ডাক দিয়ে বলেন, জমায়েত আরও বড় করতে হবে, যাতে শাসকের দমনক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সূত্র: এএফপি