২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে তদন্ত কমিশন

0
27

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। পরে যমুনায় কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশন প্রধান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন এবং সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন ও ড. মো. আব্দুল আলীম। উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান এবং সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং বাকি ১৪৭টি আসনে তথাকথিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতেই এ ব্যবস্থাপনা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে দৃশ্যত ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার একটি কৌশল গ্রহণ করে। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়।

প্রতিবেদন গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছুটা জানতামও। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে, সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে নিজেদের মতো করে কাগজে রায় লিখে দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। এর পূর্ণ রেকর্ড থাকা প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “দেশের মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। জনগণ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল, কিছুই করতে পারেনি। জনগণ যেন অন্তত কিছুটা স্বস্তি পায়, সে জন্য কারা জড়িত ছিল, কীভাবে করেছিল—সবকিছু সামনে আনতে হবে। ভবিষ্যতে যেন আর কখনো নির্বাচন ডাকাতি না ঘটে, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।”

তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের আঁধারে ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা চলছিল, যার ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি দেখানো হয়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় তথাকথিত ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর কৌশল নেওয়া হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনের ক্ষেত্রেই অভিনব ও বিতর্কিত পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রহণ করা হয়। এসব বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ একটি ‘নির্বাচন সেল’ গঠন করা হয়, যা পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কমিশনের মতে, এ সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে প্রশাসনের হাতে চলে যায়। ফলে নির্বাচন পরিচালনার প্রধান শক্তি হিসেবে নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই কার্যত নিয়ামক হয়ে ওঠে।