নবম জাতীয় বেতন কমিশন নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিশন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গিয়ে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে।
এ তথ্য জানানো হয় বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে। প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সকল পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যরা।
সরকার ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। এর আগে ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর নবম কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত শেষ সময় ছিল ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানায়, কমিশন তাদের জন্য বরাদ্দ বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয় করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এটি একটি বিশাল কাজ, যার জন্য মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছে। প্রতিবেদনের আউটলাইন দেখে বোঝা যায়, কাজটি অত্যন্ত সৃজনশীলভাবে করা হয়েছে।
এ সময় কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান বলেন, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বেড়েছে। সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতন কাঠামো না থাকায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করেছে।
তিনি জানান, নির্ধারিত কার্যপরিধি অনুসরণ করে বাস্তবসম্মত সুপারিশ তৈরির জন্য কমিশন অনলাইন ও অফলাইনে মোট ১৮৪টি সভা করেছে এবং ২ হাজার ৫৫২ জনের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাপক মতবিনিময় করা হয়। কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নির্ধারণ এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করা।
প্রতিবেদন দাখিলকালে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এখন মূল কাজ হলো এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা। সে লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হবে, যা বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।
কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি বেতন স্কেলে সুপারিশ করেছে। এতে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনপ্রধান জানান, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে আরও সুপারিশ করা হয়েছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, বিভিন্ন ভাতা পর্যালোচনার জন্য আলাদা কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।
এ ছাড়া কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ দুই সন্তান এই সুবিধা পাবে। টিফিন ভাতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ভাতার হার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমানে ২০০ টাকা টিফিন ভাতা বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।