নির্বাচনী সন্ধিক্ষণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: প্রধান উপদেষ্টা

0
25

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সংবেদনশীল সময়ে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সোমবার সেনাসদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে—এ বিষয়ে সরকার আশাবাদী।

তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই–আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত একটি জাতি জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটদানের মধ্য দিয়েই তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।

তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে মতামত দেবে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবে। এ কারণেই এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, তরুণদের একটি বড় অংশ এবারই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছে এবং অনেক নাগরিক দীর্ঘদিন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি। এমন বাস্তবতায় সকল ভোটারের জন্য ভয়মুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এই দায়িত্ব পালনে সশস্ত্র বাহিনী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সক্ষম, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনমুখী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এই গুরুদায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দিতে সর্বোচ্চ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। প্রতিটি নাগরিক যেন কোনো ভয় বা প্রভাব ছাড়াই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সে লক্ষ্যেই প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সহায়তা দিতে হবে।

নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল। সামান্য কোনো বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, তরুণ ও দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত নাগরিকদের অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তাই ভয়মুক্ত পরিবেশে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

অধ্যাপক ইউনূস একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা উপেক্ষিত ছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সরকার অল্প সময়ের মধ্যেই এই অবস্থার পরিবর্তন সূচনা করেছে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনীর স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ইতালি, জাপান ও থাইল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে অনুরূপ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে।

এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আভিযানিক দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নেওয়া এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদী।

সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান। সভায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।