বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য: প্রধান উপদেষ্টা

0
20
বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য: প্রধান উপদেষ্টা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোটকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থীকে ফলাফল মেনে নিয়ে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আর মাত্র একদিন পরই সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট—যা সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্ত এবং স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের সাফল্যের পর দেশ আবার গণতান্ত্রিক উত্তরণের যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন ও গণভোট—কোনোটিই সম্ভব হতো না।

তিনি বলেন, ভোটের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হওয়ায় এখন সবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচনকে ঘিরে প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম, প্রার্থীদের দায়িত্বশীলতা এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা এ পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে তিনি জানান, তফসিল ঘোষণার পর এবং প্রচারপর্বে ঘটে যাওয়া কয়েকটি সহিংস ঘটনায় কিছু প্রাণহানির কারণে একটি বেদনার ছায়া রয়েছে এবং গণতন্ত্রের চর্চায় প্রাণ ঝরে যাওয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং স্বতন্ত্রসহ প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি, যা অংশগ্রহণের দিক থেকে নজিরবিহীন। তিনি বলেন, এটি শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়; গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যেখানে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনজাগরণের সাংবিধানিক প্রকাশ ঘটবে। একই সঙ্গে গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে—বাংলাদেশ ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের পথে এগোবে, নাকি আবার পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক বৃত্তে ফিরে যাবে।

তরুণ ও নারী ভোটারদের উদ্দেশে আলাদা করে বক্তব্য রেখে ড. ইউনূস বলেন, আপনারা এমন এক বাস্তবতায় বড় হয়েছেন, যেখানে “ভোটের মুখোশ ছিল—কিন্তু ভোট ছিল না”; দীর্ঘ বঞ্চনার পর এই ভোট আপনাদের “প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ”। তিনি ভয়কে পেছনে রেখে সাহস নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, একটি ভোট শুধু সরকার নির্বাচন করবে না, বরং ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে এবং জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে।

নারীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব গণআন্দোলনে নারীরা শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও তারা সম্মুখসারির যোদ্ধা ছিলেন। তিনি নারীদের অর্থনীতির “চালিকাশক্তি” উল্লেখ করে বলেন, নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্রঋণ ও কুটির শিল্পের পেছনে পরিবর্তনের গল্প রয়েছে।

নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে দাবি করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও দায়িত্বে রাখা হয়েছে। তিনি জানান, প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিসরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, বডি ক্যামেরা, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রয়েছে—যার উদ্দেশ্য ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ও সম্মানের সঙ্গে ভোট দিতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং একই সঙ্গে দেশে অবস্থানরত সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আইনি হেফাজতে থাকা যোগ্য নাগরিকদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্র “কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই” এগোতে চায়—এমন বার্তা যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, যেন কেউ বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়—এ বিষয়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশ দিতে হবে। তিনি গুজব ছড়ানো থেকেও সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন এবং বলেন, একটি ত্রুটিপূর্ণ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না।

ভাষণে তিনি বলেন, একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মধ্যে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে। যাচাই ছাড়া তথ্য শেয়ার না করা এবং প্রয়োজন হলে সরকার নির্ধারিত হটলাইন ৩৩৩-এ ফোন করে সঠিক তথ্য জানার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি “অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না”—এমন প্রচারকে ভিত্তিহীন অপপ্রচার বলে উল্লেখ করে বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করেই অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।

জুলাই জাতীয় সনদ প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, এটি কোনো দলের একক ইশতেহার নয়; দীর্ঘ আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি ঐতিহাসিক দলিল। তিনি বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকলেও তার সফলতা নির্ভর করবে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সম্মতির ওপর; সে কারণেই গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। তিনি গণভোটকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক উল্লেখ করে বলেন, এই ভোটের প্রভাব বহু প্রজন্মজুড়ে থাকবে এবং এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্র পরিচালনার নানা স্তরে প্রভাব ফেলবে।

ভোট ও গণভোটে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নিশ্চিত করুন। তিনি জানান, নির্বাচন শেষে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নেবে এবং তারা সেই “শুভ মুহূর্তের” জন্য অপেক্ষা করছে।