কৃষিকে লাভজনক খাতে নিতে সরকারের বড় পরিকল্পনা

0
21
কৃষিকে লাভজনক খাতে নিতে সরকারের বড় পরিকল্পনা

কৃষিকে একটি টেকসই ও লাভজনক খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘স্মার্ট কৃষি’ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকার একগুচ্ছ মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এসব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ১৪ এপ্রিল ‘কৃষক কার্ড’-এর উদ্বোধন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ১০ ধরনের সেবা পাবেন।

বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আউয়াল-এর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ এবং খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কৃষিখাতকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যেই সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

‘কৃষক কার্ড’ এই উদ্যোগগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রদান, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্র সরবরাহ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ, কৃষি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য এবং ফসলের রোগ-বালাই দমনে পরামর্শসহ মোট ১০টি সেবা দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনা হবে।

কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি আধুনিক সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণেও গুরুত্ব দিয়ে ট্রাক্টর, হারভেস্টার, রিপারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি প্রদান করে কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করা হচ্ছে।

পতিত জমি চাষের আওতায় আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী ফসল নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে উৎপাদন বাড়ছে এবং জমির অপচয় কমছে। একই সঙ্গে খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার বাড়িয়ে পতিত জমি আবাদযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল ও চরাঞ্চলের পতিত জমি চাষের আওতায় আনতে বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণেও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। একসময় যেখানে কৃষি প্রধানত ধাননির্ভর ছিল, এখন সেখানে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা ও ফুল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর ফলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি পুষ্টি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হচ্ছে।

কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে কৃষক কার্ড ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ, সার, কৃষিযন্ত্র ক্রয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রদান সহজ হবে। পাশাপাশি স্বল্প সুদের কৃষিঋণ এবং ফসল বীমা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালু রয়েছে।

বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪০১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণে ব্যয় করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ ২২ হাজার কৃষক উপকৃত হয়েছেন।

কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল স্থাপন এবং ক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকার ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী এবং স্বল্পমেয়াদি নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবনে কাজ চলছে। বিশেষ করে জলবায়ু সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততা, খরা ও বন্যা সহনশীল ফসল চাষ, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার। এছাড়া কম সেচ, কম রাসায়নিক সার ও কম কীটনাশক ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সেচ ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়াতে প্রি-পেইড মিটার স্থাপন এবং Alternate Wetting and Drying (AWD) পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ‘খামারি এ্যাপস’সহ বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে কৃষকদের কাছে স্থানভিত্তিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিক, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব খাতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জীবনমানও উন্নত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here