সাড়ে ১৭ ঘণ্টায় একই পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু, জয়পুরহাটে শোকের ছায়া

0
52

বিকেল গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ। জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভাদসা ইউনিয়নের বড় মাঝি পাড়া গ্রামের বাড়িটা নিস্তব্ধ। উঠানের দুই খাটিয়ায় পাশাপাশি শুয়ে আছেন মা সালেহা বেগম (৬৫) ও মেয়ে বিলকিস বেগম (৩৮)—দুজনই নিথর। পাশে বসে বাকরুদ্ধ বিলকিসের স্বামী ছানোয়ার হোসেন, স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন স্ত্রী ও শাশুড়ির মরদেহের দিকে। কয়েক হাত দূরেই চলছে কবর খোঁড়ার কাজ; সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন মা–মেয়ে।

এর আগে রোববার (৩০ নভেম্বর) রাতে এই পরিবারেরই আরেক সদস্য, সালেহা বেগমের নাতি ও বিলকিসের ভাতিজা তুহিন হোসাইন (২৫) হাসপাতালের বেডেই মারা যান। সাড়ে ১৭ ঘণ্টার ব্যবধানে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক।

পরিবার ও গ্রামবাসী জানায়, তুহিন জয়পুরহাট সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। তিনি জয়পুরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার রাত ৮টার দিকে মারা যান। সোমবার সকালে তাকে দাফন করা হয়।

এদিকে এর আগের দিন শনিবার (২৯ নভেম্বর) বিলকিসের শাশুড়ি শেফালী বেগম ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একই হাসপাতালে ভর্তি হন। তাকে দেখতে গিয়ে বিলকিসও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন এবং রোববার সকালে ভর্তি হন। ওই দিনই বিলকিসের মা সালেহা বেগমও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একই ওয়ার্ডে ভর্তি হন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।

ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার মা, স্ত্রী আর শাশুড়ি—তিনজনই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। আমার মা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু আজ আমার শাশুড়ি আর স্ত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩৫ মিনিটের ব্যবধানে মারা গেলেন। এর আগে রোববার রাতে হাসপাতালে আমার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলে তুহিন মারা গেছে।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুর কথা অস্বীকার করেছে। জয়পুরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সরদার রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, ‘হাসপাতালে যে দুইজন মারা গেছেন, তারা মা ও মেয়ে। তারা ডায়রিয়ায় নয়, শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন। তারা ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন না।’

নিহত সালেহা বেগম বড় মাঝি পাড়া গ্রামের মৃত খাজা মদ্দিনের স্ত্রী। তার মেয়ে বিলকিস বেগম দীর্ঘদিন জর্ডান প্রবাসে থেকে তিন বছর আগে দেশে ফেরেন। হঠাৎ এভাবে মা–মেয়েসহ তিনজনের মৃত্যু মানতে পারছেন না গ্রামবাসী।

প্রতিবেশী রুবেল হোসেন বলেন, ‘মাত্র ১৭ ঘণ্টার ব্যবধানে একই পরিবারের তিনজন মারা গেছেন। এর মধ্যে দুজন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’

সোমবার দুপুর পৌনে ১টায় সালেহা বেগম হাসপাতালে মারা যান। মাত্র ৩৫ মিনিট পর মারা যান মেয়ে বিলকিস বেগম। বিকেলে মা–মেয়ের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বড় মাঝি পাড়া গ্রামের আকাশ-বাতাস। একসঙ্গে তিনটি কবর খোঁড়ার দৃশ্য আরও যেন ভারী করে তোলে শোকাহত জনপদের নিস্তব্ধতা।