আদানির চুক্তি বাতিলে সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতে যাওয়ার পরামর্শ

0
25

বাংলাদেশের সঙ্গে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে পর্যালোচনা কমিটি। চুক্তিটি বাতিলের লক্ষ্যে সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাত-আটজন ব্যক্তি অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন বলেও কমিটি জানিয়েছে।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটি এসব তথ্য তুলে ধরে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গঠিত পাঁচ সদস্যের এই কমিটি হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কাজ করে এবং গত ২০ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানির সঙ্গে করা চুক্তিতে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির আলামত পাওয়া গেছে। এসব তথ্য আদানি পাওয়ারকে জানিয়ে তাদের ব্যাখ্যা চাওয়া প্রয়োজন এবং এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে সিঙ্গাপুরে সালিশি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি জানান, দেরি হলে আইনি জটিলতার কারণে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে যেতে পারে। লন্ডনের বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক মতামতের বরাতে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় এমন তথ্য খুবই বিরল।

এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মোশতাক জানান, চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাত-আটজন ব্যক্তির কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ব্যক্তির ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে এবং দুদক ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোনো হিসাবে লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়নি।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার অন্যান্য উৎস থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কিনেছে, তার তুলনায় আদানির কাছ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৪ থেকে ৫ সেন্ট বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। ভারতের গ্রিড থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের তুলনায়ও আদানির বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চুক্তি অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়ায় স্থান নির্বাচন, দাম নির্ধারণ ও শর্ত আরোপ—সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ভারতের গ্রিড থেকে বিদ্যুতের দাম যখন ৪ দশমিক ৮ সেন্ট ছিল, তখন আদানির ক্ষেত্রে তা ধরা হয় ৬ দশমিক ৮ সেন্ট, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে পৌঁছায়।

চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মত দিয়েছে কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে আদানির ক্ষতি হলে সেই দায় বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হবে। সব অর্থ পরিশোধ করতে হবে ডলারে এবং মাসিক সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা সরকারের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

এদিকে আদানি পাওয়ার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন বিষয়ে তারা কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ পায়নি এবং প্রতিবেদনটিও তাদের কাছে পৌঁছায়নি। এ কারণে তারা এ বিষয়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করতে পারছে না। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে মতামত বা তথ্য চায়নি।

আদানি আরও জানায়, তারা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং দেশের প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করে আসছে। বড় অঙ্কের বকেয়া পাওনা থাকা সত্ত্বেও তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। তবে বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না হলে তাদের কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।