জাতির উদ্দেশে ভাষণে ইরান যুদ্ধ নিয়ে যা বললেন ট্রাম্প

0
23
জাতির উদ্দেশে ভাষণে ইরান যুদ্ধ নিয়ে যা বললেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আর দুই তিন সপ্তাহেই শেষ হয়ে যাবে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বুধবার (১ এপ্রিল) রাতে হোয়াইট হাউস থেকে ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণে এই দাবি করেন তিনি।

ট্রাম্প আমেরিকার জনগণের উদ্দেশে দেয়া এই ভাষণে বলেন, গত চার সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানের ওপর ‘দ্রুত, নির্ণায়ক ও ব্যাপক’ আঘাত হানা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই অভিযানে এমন ধরনের বিজয় অর্জিত হয়েছে, যা খুব কম মানুষ আগে কখনও দেখেছে।

তার মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের সামরিক শক্তির ওপর ধ্বংসাত্মক আঘাত হেনেছে। খুব শিগগিরই যুদ্ধ শেষ হবে। ইরান আর দুই তিন সপ্তাহের বেশি লড়াই চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।

ট্রাম্প বলেন, ‘আজ রাতে ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশটির বিমান বাহিনীও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং অধিকাংশ নেতাই এখন মৃত।’ আরও বলেন, ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর-এর কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা এই মুহূর্তে ধূলিসাৎ করা হচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন উৎক্ষেপণের ক্ষমতাও এখন আর তত শক্তিশালী নেই। ইরানের অস্ত্র কারখানা ও রকেট লঞ্চারগুলো টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘মার্কিন অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের নৌবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা এবং ওদের পরমাণু বোমা তৈরির ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়া।’ ট্রাম্প জানান, সামরিক শক্তি হিসাবে আমেরিকা অপ্রতিরোধ্য। তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ আমেরিকার শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি প্রকৃত বিনিয়োগ।’

যুদ্ধ আর দুই তিন সপ্তাহ চলবে জানিয়ে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, এই সময়টাতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা আরও জোরদার করবে এবং তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেয়া’ হতে পারে।

বুধবারের ভাষণে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। দাবি করেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা কম। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রণালী দরকার নেই। অন্যান্য দেশের দরকার।

তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য দেশগুলো জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও দাম বৃদ্ধির চাপ বেশি বহন করছে। টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রায় কোনো তেল আমদানি করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না। আমাদের এর প্রয়োজন নেই।’

তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে তেল ও গ্যাস উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে এবং দাবি করেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সরবরাহ সংকটে দেশটি তেমন প্রভাবিত নয়। তবে অনেক আমেরিকানের কাছে এই দাবি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে, কারণ তারা জ্বালানির দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের বেশি হওয়ায় চাপ অনুভব করছেন।

ট্রাম্পের এসব বক্তব্যে এটিও উপেক্ষা করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা এই যুদ্ধ বৈশ্বিক বাজার ও অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার খেসারত দিচ্ছে এশিয়া ও ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার বেশিরভাগই এশিয়ায় যায়। এই অঞ্চলটি উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

ট্রাম্প বলেন, ‘যেসব দেশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পায়, তাদেরই এই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত… আমরা সহায়তা করব, কিন্তু যেসব দেশ এই তেলের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, তাদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, ঘাটতির মুখে পড়া দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনতে পারে।

তিনি আরও দাবি করেন, যুদ্ধ শেষ হলেই প্রণালীটি আবার খুলে যাবে এবং ‘জ্বালানির দাম দ্রুত কমে আসবে’—যা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা দ্বিমত পোষণ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ বিঘ্নের কারণে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও বৈশ্বিক তেলের দাম কিছু সময় উচ্চ অবস্থায় থাকতে পারে।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের নতুন নেতারা ‘কম উগ্রপন্থি এবং অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত’। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার জন্য আলোচনা চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তিনি দাবি করেন, ‘তাদের আগের সব নেতার মৃত্যু হয়েছে’, তাই যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই সরকার পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ) ঘটাতে পেরেছে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ শেষ করার আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর ওপর নজর রাখছে।

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যদি কোনো চুক্তি না হয়, তাহলে আমরা তাদের প্রতিটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র খুব জোরালোভাবে এবং সম্ভবত একসঙ্গে আঘাত করব।’ তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের তেল স্থাপনাগুলো এখনো লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি, যদিও সেটি ‘সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য’। কারণ এতে তাদের টিকে থাকা বা পুনর্গঠনের কোনো সুযোগই থাকত না।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইসরাইল ও সিএনএন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here