বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শীত মানেই মেলা আর যাত্রাপালার আয়োজন। প্রতিবছরই শীতের এই সময়কে ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে নানা অনুষ্ঠান। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার মধ্যবারাহির চর গ্রামে এমনই এক জমজমাট গ্রামীণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে। আর এই মেলায় অন্যতম আকর্ষণ ‘কমলার বনবাস’ নামে জনপ্রিয় একটি যাত্রাপালা। মেলার এই আয়োজনে আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
শীতের হিমেল পরশে জমে উঠেছে মধ্যবারাহির চর গ্রামের মেলা। আশেপাশের আট থেকে দশটি গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী এবং শিশুরা দলবেঁধে মেলায় আসছেন। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে মেলার মাঠে বাড়তে থাকে কোলাহল। গ্রামীণ জীবনের এক বিশেষ রূপ ফুটে ওঠে এই মেলায়। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন বহুল প্রতীক্ষিত যাত্রাপালার জন্য।
রাত নয়টায় যাত্রা মঞ্চে আসেন যাত্রা শিল্পীরা। শুরুতেই একটি স্বাগত সংগীতের মাধ্যমে দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায় তারা। এরপর যাত্রা শুরু হয়। ‘কমলার বনবাস’ নামের এই যাত্রাপালায় সতী ও সাহসী নারী কমলার বনবাসের করুণ ও সাহসিকতার গল্প তুলে ধরা হয়। এই কাহিনিতে কমলার প্রেমিকের প্রতি ভালোবাসা এবং বনবাসে তার চরম আত্মত্যাগ দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হন।
যাত্রাপালায় প্রধান চরিত্র কমলা ছাড়াও ভিলেন এবং বিভিন্ন চরিত্র রয়েছে, যা দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে রাখে। প্রধান ভিলেনের চরিত্রটি দারুণ অভিনয়ে মঞ্চ মাতিয়ে তোলে, যা দর্শকদের মাঝে এক ভিন্ন রকমের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। কমলার বনবাসের কষ্ট, সাহস এবং আত্মত্যাগের চিত্রায়ণ গ্রামবাসীর হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। গল্পের প্রতিটি ধাপ এবং প্রতিটি মুহূর্তে দর্শকদের মুখে মুগ্ধতার ছাপ ফুটে ওঠে। যাত্রাপালা শেষ না হওয়া পর্যন্ত গভীর রাত অবধি দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করতে থাকেন।

স্থানীয়দের মতে, গ্রামীণ মেলা এবং যাত্রাপালার এমন আয়োজন শুধু বিনোদন নয়; এটি গ্রামবাসীর সামাজিক বন্ধনকে আরও মজবুত করে। গ্রামের প্রবীণ ও তরুণদের মাঝে এই ধরনের আয়োজন তাদের মেলবন্ধন এবং আন্তরিকতা আরও গভীর করে তোলে।
মধ্যবারাহির চর গ্রামের বাসিন্দা রহমত আলী জানান, প্রতিবছর শীতে মেলায় আসার অপেক্ষায় থাকি। আমাদের এই যাত্রাপালা ‘কমলার বনবাস’ আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ধরে রাখে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখতে এসেছি। এমন আয়োজন যেন প্রতি বছর হয়, এটাই চাই।
যাত্রা দেখতে আসা শিউলি বেগম জানান, ছোটবেলায় দাদা-দাদির সঙ্গে মেলায় আসতাম। এখন ছেলেকে নিয়ে আসছি। ‘কমলার বনবাস’ যাত্রাপালার কাহিনি খুবই সুন্দর। আমার সন্তানদের আমাদের এই পুরোনো ঐতিহ্য দেখাতে পেরে আনন্দ পাচ্ছি।
আরিফ শেখ বলেন, গ্রামে খুব বেশি বিনোদনের সুযোগ নেই। এই যাত্রাপালা আমাদের গ্রামীণ জীবনে এক ভিন্ন রকম আনন্দ এনে দেয়। সারা দিন কাজের পর এমন কিছু উপভোগ করতে পারলে ভালো লাগে। যাত্রাপালার প্রতিটি দৃশ্য চমৎকার ছিল।
তরুণ দর্শক ফারজানা আক্তার বলেন, এটাই আমার জীবনের প্রথম যাত্রাপালা দেখা। ‘কমলার বনবাস’ খুব ভালো লেগেছে। এমন যাত্রা দেখে মনে হলো আমাদের পূর্বপুরুষের সংস্কৃতি কতটা সুন্দর ছিল। আমি খুবই মুগ্ধ।
পাশের গ্রাম থেকে এসেছেন কৃষক রফিকুল ইসলাম। তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, আগে রাত জেগে যাত্রাপালা ও গান শুনতাম। এখন তো সেই সুযোগ নাই। এই গ্রামে ৮ থেকে ১০ বছর ধরে এই সময়ে যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়। অনেক মানুষ হয়। যাত্রাপালা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এখনকার ছেলেমেয়েরা এসব কম দেখে, তাই আমাদের সবার উচিত এই ধরনের আয়োজন চালিয়ে যাওয়া।
মধ্যবারাহির চর মেলা কমিটির সভাপতি বাবু বেপারী বলেন, যাত্রাপালা শুধু বিনোদন নয়; এটি গ্রামের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করে তোলে। এমন আয়োজনে গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে নতুন করে ঐতিহ্যকে অনুভব করেন। ভবিষ্যতেও আমাদের এই আয়োজন অব্যাহত থাকবে।

