শিক্ষার্থীদের ‘দেশের শত্রু’ ভাবছে মোদি সরকার: সোনিয়া গান্ধী

0
3
শিক্ষার্থীদের ‘দেশের শত্রু’ ভাবছে মোদি সরকার: সোনিয়া গান্ধী

ভারতজুড়ে চলমান শিক্ষার্থী বিক্ষোভ দমন এবং তা মোকাবিলায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী। তিনি বলেছেন, নরেন্দ্র মোদির সরকার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘দেশের শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি একথা বলেন।

নিবন্ধে সোনিয়া লেখেন, ‘শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে জবাবদিহি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করেছে। কিন্তু মোদি সরকার তাদের সাহসের জবাব দিয়েছে কাপুরুষোচিত আচরণ ও নির্বিচার নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে। ভবিষ্যতের উত্তরসূরি হিসেবে দেখার বদলে তাদের দেশের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’

তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে পরিচালিত পুলিশ বাহিনীর হাতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীদের ওপর যে ‘নৃশংসতা’ চালানো হয়েছে, তা এই সরকারের ক্ষেত্রে নতুন কিছু নয়।

সোনিয়া বলেন, ‘২০২০ সালে সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের সময় সশস্ত্র পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অভিযান চালিয়েছিল, তা আমরা সবাই স্পষ্টভাবে মনে রেখেছি। ভারতের নারী কুস্তিগিরদের বিরুদ্ধে চালানো অগ্রহণযোগ্য আচরণও কখনও ভোলা যাবে না।’

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক অবনতির প্রতিবাদে সারা ভারতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ক্রমেই জোরালো হয়েছে। গত ২০ জুলাই দিনটিকে ‘কলঙ্কের দিন’ হিসেবে উল্লেখ করে সোনিয়া দাবি করেন, সেদিন দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে।

তিনি বলেন, ওই ঘটনায় বহু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী আহত হন। এমনকি বাড়ি ফিরছিলেন— এমন শিক্ষার্থীদেরও ছাড় দেয়া হয়নি; পুলিশ নির্বিচারে লাঠিপেটা করেছে তাদের।

নিবন্ধে তিনি লেখেন, ‘দেশ এমন কিছু হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখেছে, যেখানে পেলেটের আঘাতে তরুণদের শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এমন অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহই দিয়েছেন। এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।’

সোনিয়া বলেন, ‘সেদিনের ভিডিওগুলো আমাদের স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে গেঁথে গেছে এবং জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এখন জোরালোভাবে বলার সময় এসেছে— থামুন, এরা আমাদেরই ছেলে-মেয়ে, আমাদেরই তরুণ-তরুণী।’

তিনি অভিযোগ করেন, ভিন্নমতকে ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেয়ার সরকারের পুরোনো কৌশল এবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দুর্বল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। সোনিয়ার ভাষায়, আন্দোলনের কারণ খতিয়ে দেখে নিজেদের নীতির আত্মসমালোচনা করার বদলে মোদি সরকার নানা ষড়যন্ত্রের গল্প ছড়িয়ে আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘অবনমিত’ করেছে এবং দেশের শিক্ষার্থীরা মোদি সরকারের ‘ভাঁওতা’ ধরে ফেলেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা নৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

নিবন্ধে সোনিয়া লেখেন, ‘আজকের হতাশাজনক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মোদি সরকারের অহংকার, জবাবদিহি এড়িয়ে চলা ও গঠনমূলক আলোচনায় অনীহা—এই দুইয়ের সম্মিলিত ফলই বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলন।’

তার মতে, সমস্যার মূল কারণগুলোর একটি হলো সরকারি শিক্ষা থেকে মোদি সরকারের সরে আসা। তিনি দাবি করেন, স্কুলশিক্ষায় মোট বাজেটের যে অংশ ব্যয় করা হয়, তা সরকার ৫০ শতাংশ কমিয়েছে। আর উচ্চশিক্ষায় ব্যয়ের অংশ কমেছে ৩৩ শতাংশ। সোনিয়া প্রশ্ন তোলেন, ‘এমন অযৌক্তিকভাবে পিছিয়ে যাওয়ার কোনও যৌক্তিকতা কি কেউ খুঁজে পান?’

তিনি আরও বলেন, গত ১২ বছরে মোদি সরকার প্রায় এক লাখ সরকারি স্কুল বন্ধ করেছে। একই সময়ে ৪৩ হাজার বেসরকারি স্কুল চালু হয়েছে, যার বড় একটি অংশ পরিচালনা করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। আর তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিলে আরএসএসই ভারতে সবচেয়ে বড় বেসরকারি স্কুল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।

উচ্চমানের এবং সাশ্রয়ী সরকারি শিক্ষা নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় পরিবারগুলোকে নিজেদের অর্থ খরচ করে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তার মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষা নিয়ে জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়া এবং আন্তরিক আলোচনায় বসতে সরকারের ধারাবাহিক ও সচেতন অনীহা।

সোনিয়া অভিযোগ করেন, জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা (এনটিএ) শক্তিশালী করার জন্য শিক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যে সুপারিশ করেছিল, তা শুধু কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য ছিলেন— এই কারণ দেখিয়ে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। এর মাধ্যমে তিনি জবাবদিহির প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন।

এত বড় বড় ব্যর্থতার পরও তার পদত্যাগে অনীহা জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সোনিয়া গান্ধী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here