রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পুলিশ বাহিনীর জনবল ও যানবাহনের সংকট বিবেচনায় মন্ত্রিসভার ১৮ সদস্যের জন্য বরাদ্দ পুলিশের বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট প্রত্যাহার করেছে সরকার। তবে দায়িত্বের গুরুত্ব বিবেচনায় ছয়জন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার ক্ষেত্রে এ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।
এর আগে গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীও নিজের নিরাপত্তা বহরের আকার ছোট করার সিদ্ধান্ত নেন।
একাধিক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাদের ভাষ্য, গত সপ্তাহ থেকে ধাপে ধাপে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা শনিবার জানান, গত সপ্তাহে সরকারের জারি করা নির্দেশনার পর থেকেই অনেক মন্ত্রীর বিশেষ পুলিশ এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা শুধু ব্যক্তিগত গানম্যান পাচ্ছেন।
সরকারি সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ঢাকায় চলাচলের সময় অধিকাংশ মন্ত্রী পুলিশের বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট সুবিধা পেয়ে আসছিলেন। বর্তমানে মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী। এসকর্ট প্রত্যাহার করা হলেও সরকারি বিধি অনুযায়ী তারা আগের মতোই গানম্যান, হাউস গার্ড এবং ঢাকার বাইরে সফরকালে প্রয়োজনীয় পুলিশি নিরাপত্তা পাবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিআইপি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যয় কমাতে পুলিশ সদর দপ্তরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়। দীর্ঘদিনের জনবল ও যানবাহনের সংকটও এ সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ।
একজন মন্ত্রীর এসকর্ট দলে সাধারণত একজন উপপরিদর্শক (এসআই) ও চারজন কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করেন। তাদের জন্য একটি পুলিশ পিকআপ ভ্যান বরাদ্দ থাকে এবং সদস্যদের বেতন-ভাতা ও যানবাহনের জ্বালানি ব্যয় সরকারি কোষাগার থেকে বহন করা হয়।
বর্তমানে যেসব মন্ত্রী ও উপদেষ্টা পুলিশের বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট সুবিধা পাচ্ছেন তারা হলেন— স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অন্যদিকে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, শিল্প, বস্ত্র, পাট ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী অ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বিশেষ এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শুধু ঢাকাতেই ৪৯ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন ১ হাজার ৬৯১ জন পুলিশ সদস্য। প্রয়োজন রয়েছে ২ হাজার ৫৭৫ জনের। অর্থাৎ, প্রায় ৯০০ সদস্যের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে দায়িত্বে থাকা সদস্যদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে এবং তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জনবল সংকটের পাশাপাশি যানবাহনের অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনায় হামলায় প্রোটেকশন ইউনিটের বেশ কয়েকটি যানবাহন পুড়ে যায়। ফলে বর্তমানে একটি গাড়ি দিয়েই একাধিক ভিআইপির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। সীমিত জনবল ও যানবাহন নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।