চলনবিলের শুঁটকি চাতালে নারী শ্রমিকদের মজুরিতে বৈষম্য

শুঁটকি উৎপাদনে এ অঞ্চলের চাতালগুলোতে এখন কর্মব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক। নারীরা পুরুষের সমান কাজ করেও তারা মজুরি পান অর্ধেক।

0
202

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ ও শাহজাদপুর উপজেলার চলনবিল এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক শুঁটকির চাতাল। শুঁটকি উৎপাদনে এ অঞ্চলের চাতালগুলোতে এখন কর্মব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক। নারীরা পুরুষের সমান কাজ করেও তারা মজুরি পান অর্ধেক। এতে শ্রমের মজুরীর বৈষম্যে খুশি নন নারী শ্রমিকরা।

মৎস্যজীবীদের ভাষ্য, চলনবিলে এ বছর দুই দফায় বন্যার পানি এসেছে। ফলে প্রচুর পরিমাণে দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরা পড়েছে জেলেদের জালে। পুঁটি, খলসে, চেলা, টেংরা, কই, মাগুর, শিং, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, গুচিবাইম, বোয়াল, ফলি, কাতল, লওলা, শোল, গজারসহ নানা জাতের মাছ ধরা পড়ে এই বিলে। কোনো প্রকার রাসায়নিকের মিশ্রণ ছাড়াই শুধু লবণ যুক্ত করে মাছ সূর্যের আলোয় শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। এই শুঁটকি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ভারত ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

জানা যায়, জেলার চারটি উপজেলায় মিঠা পানির দেশীয় মাছের শুঁটকি উৎপাদন হয়। অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে শুঁটকি উৎপাদন। এই মৌসুম চলবে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব চাতালে মাছ কাটা,পরিস্কার এবং রোদে শুকানোর কাজ করেন শ্রমিকরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাতালে নারী শ্রমিকরা পুরুষের সমান কাজ করলেও মজুরী পায় পুরুষের অর্ধেক। নারী শ্রমিকদের দাবি, পুরুষের সমান মজুরী দিয়ে বৈষম্য দূর করা হোক।

এব্যপারে উল্লাপাড়ার বাসিন্দা জয়ন্তী দাস বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুঁটকির চাতালে কাজ করি। অথচ প্রতিদিন মজুরি পায় ২০০ টাকা। আমাদের থেকে অনেক পরে পুরুষ শ্রমিকরা কাজে আসেন। তাদের দৈনিক মজুরি দেওয়া হয় ৫০০ টাকা। আমাদের সাথে মজুরী নিয়ে বৈষম্য করা হচ্ছে।

তাড়াশের দেবিপুর গ্রামের বাসিন্দা ছকিনা খাতুন বলেন, পাঁচ জনের সংসার আমার। আমার উপার্জনের ওপর পুরো সংসার নির্ভরশীল। স্বামী মানসিক প্রতিবন্ধী। কোনো কাজ করেন না। চাতালে একই সমান কাজ করে পুরুষ পায় ৫০০ টাকা প্রতিদিন। আমি পাই মাত্র ২০০ টাকা। বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম অনেক। ২০০ টাকা দিয়ে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়।

নারী শ্রমিক শাহিনুর বেগম বলেন, পরিবারে অভাব থাকায় চাতালে সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যায় মালিক ২০০ টাকা দেন। সারাদিন পুরুষের সমান কাজ করে অর্ধেক মজুরি পেলে অসহায় লাগে। কাজের ন্যায্য মজুরি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের উপ-পরিচালক মোছা. রোখসানা খাতুন বলেন, প্রায় সব কাজেই মজুরি বৈষম্যের শিকার নারী। এর মূল কারণ আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অবদান ছোট করে দেখা হয়। অতিদ্রুত আমি নিজেই শুঁটকির চাতালে যাব। নারী শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো নিয়ে শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলব।

চাতাল মালিক বায়েজিত হোসেন নারী শ্রমিকদের মজুরির কথা স্বীকার করেন জানান, আগে একজন চাতাল মালিক ন্যূনতম ২০ থেকে ২৫ টন শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণন করেছেন। দুই-তিন বছর ধরে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ অঞ্চলে বরাবরই নারী শ্রমিকদের মজুরি কম ছিল। তারা সেভাবেই মজুরি দিচ্ছেন। নারী শ্রমিকদের দাবি পূরণে চাতাল মালিকরা আন্তরিক। শুঁটকির উৎপাদন বাড়লে বিষয়টি যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে।

সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো.শাহীনুর রহমান বলেন, জেলার চারটি উপজেলায় গত বছর ৩১৭ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছে। এ বছর প্রায় ৩৫০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আছে। মৎস্য ভান্ডার খ্যাত চলনবিলের দেশি মাছ সুস্বাদু ও মানসম্পন্ন হওয়ায় বিদেশের বাজারে এই মাছের শুঁটকির চাহিদা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে শুঁটকির উৎপাদনও।

তিনি আরো বলেন, নারী শ্রমিকদের মজুরি কম দেওয়ার বিষয়টি অবগত হয়েছি। তাদের মজুরি বৃদ্ধির ব্যাপারে মৎস্য বিভাগ থেকে চাতাল মালিকদের সাথে আলোচনাপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here