শ্বেতপত্র কমিটির কাজ চুরির বর্ণনা দেওয়া, চোর ধরা নয়

গত ১৫ বছরে প্রতি বছর গড়ে $১৬ বিলিয়ন অর্থ পাচার হয়েছে। এটি বিদেশি সাহায্য ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহের সম্মিলিত মানের দ্বিগুণ।

0
195

বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশে সরকারি দুর্নীতি, আর্থিক অপব্যবস্থা, এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যর্থতা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি।

সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, এই শ্বেতপত্র কোনো ব্যক্তির দোষ অনুসন্ধানের জন্য নয়; বরং দুর্নীতির প্রক্রিয়া বোঝার জন্য প্রণীত।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, শ্বেতপত্রটি প্রথাগত গবেষণার বাইরে গিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার মাধ্যমে এটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি সরকারের কাছে একটি দলিল হিসেবে থাকবে এবং নীতিনির্ধারণে সহায়তা করবে।

তিনি আরও জানান, ১২ জন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি বিনা পারিশ্রমিকে ৯০ দিনের মধ্যে ১৮টি সভা করে শ্বেতপত্রটি প্রস্তুত করেছে।

শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ বছরে প্রতি বছর গড়ে $১৬ বিলিয়ন অর্থ পাচার হয়েছে। এটি বিদেশি সাহায্য ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহের সম্মিলিত মানের দ্বিগুণ।

রাজস্ব ফাঁকি ও আর্থিক ক্ষতি
কর ফাঁকি, কর ছাড়ের অপব্যবহার এবং দুর্বল অর্থ ব্যবস্থাপনার কারণে রাষ্ট্র বিশাল পরিমাণ সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কর ছাড় অর্ধেকে নামিয়ে আনলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যথাক্রমে দ্বিগুণ ও তিনগুণ করা সম্ভব।

ব্যাংকিং খাতের সংকট
রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ প্রদান, ধারাবাহিক ঋণ খেলাপি এবং জালিয়াতি ব্যাংকিং খাতকে বিপর্যস্ত করেছে। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৪টি মেট্রো সিস্টেম বা ২৪টি পদ্মা সেতুর সমান।

সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি
বড় প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে গড় ব্যয় ৭০% বেড়েছে এবং সময়সীমা পাঁচ বছরের বেশি অতিক্রম করেছে। বিগত ১৫ বছরে উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ করা $৬০ বিলিয়নের মধ্যে ১৪ থেকে ২৪ বিলিয়ন দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় হয়েছে।

খাদ্য সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা
চাল, ভোজ্যতেল এবং গমের মতো প্রধান খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে অব্যবস্থাপনা বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে। ক্রয় নীতিমালায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।

পরিবেশগত অবক্ষয়
জলবায়ু অভিযোজন তহবিলে দুর্নীতি পরিবেশ সুরক্ষার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করেছে। রাজনৈতিকভাবে ব্যবস্থাপিত জলবায়ু তহবিল অপব্যবহারের শিকার হয়েছে।

শ্রম অভিবাসনের শোষণ
গত এক দশকে হুন্ডির মাধ্যমে $১৩০০ বিলিয়ন অর্থ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ভিসা ক্রয়ের জন্য ব্যয় করেছে। সিন্ডিকেটের কারণে অভিবাসী শ্রমিকরা ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্কে ত্রুটি
সামাজিক সুরক্ষা প্রোগ্রামে তহবিলের অপব্যবহারের কারণে প্রকৃত দরিদ্র মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ড. দেবপ্রিয় জানান, শ্বেতপত্রটিকে এখনো খসড়া হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চূড়ান্ত সংস্করণ আগামী মাসে প্রকাশিত হবে এবং এটি সরকারের অনুমোদিত দলিল হিসেবে গণ্য হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here