পর্যটনের চাপে ‘মৃত্যুমুখে’ টাঙ্গুয়ার হাওর

0
75

সম্পদ আর সৌন্দর্যে ভরপুর টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট (আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি)। নিয়মানুযায়ী এই হাওরের জলাভূমি চিহ্নিত করে মাছ এবং পাখির নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি করার কথা থাকলেও পর্যটন ব্যবসার নামে ধ্বংস করা হচ্ছে হাওরের জীববৈচিত্র। ফলে রূপের যাদু এই টাঙ্গুয়ার হাওর এখন মৃত্যু পথযাত্রী। জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ জলাভূমি হিসেবে রামসার ঘোষণার পরও নজরদারির অভাবে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

মূলত আকা-বাঁকা পথ, ঝরনা থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানি, দূর আকাশে মেঘের খেলা, অগণিত পাখির কলতান আর পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল-করচ বনের অপরূপ সৌন্দর্যের দেখা মেলে টাঙ্গুয়ার হাওরে। মূলত বর্ষা ও শীত এই দুই মৌসুমে দুই রকমের সৌন্দর্যে অপরূপ হয়ে ওঠে এই হাওর। তবে পর্যটকদের মতে, এই হাওর তার আসল সৌন্দর্যে সাজে বর্ষাকালে।

জানা যায়, সুনামগঞ্জের পর্যটন স্পটের মধ্যে সবচেয়ে সৌন্দর্যের আধার টাঙ্গুয়ার হাওর। হাওরটি রূপে-গুণে এরই মধ্যে দেশবিদেশের পর্যটকদের নজর কেড়েছে। তাই বর্ষা মৌসুমে সুযোগ পেলেই ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহর থেকে বেরিয়ে এসে পর্যটকরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন এই সৌন্দর্য দর্শনীয় স্থানে।

বিশেষ করে চলতি বছর জেলায় বড় ধরনের পাহাড়ি ঢল কিংবা বন্যা পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ায় ঈদুল আজহার সরকারি ছুটিকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরের তুলনায় এই বছর জেলার টাঙ্গুয়ার হাওরের সবচেয়ে বেশি পর্যটকদের ঢল নামে। প্রতিদিন ভোর সকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা বিলাসবহুল হাউজবোট নিয়ে ছুটে চলেছেন হাওরের সৌর্ন্দয উপভোগ করতে। এতে হাওর পাড়ের থাকা কর্মহীন মানুষদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জমে উঠেছে জেলার পর্যটন খাত।

হাওরে ঘুরতে আসা পর্যটকদের ভাষ্য, এত সুন্দর পর্যটন স্পট আমরা এর আগে দেখিনি। এখানে এসে প্রকৃতির মায়ায় পড়ে গেছি। তবে এখানকার হাউজবোটগুলো পর্যটকদের জিম্মি করে বাড়তি টাকা আদায় করছে।

তবে জেলার পর্যটন ব্যবসাকে চাঙা করতে গিয়ে জীবিত টাঙ্গুয়ার হাওর এখন সংকটাপন্ন। পর্যটনের দোহাই দিয়ে হাওরে অবাধে দুই শতাধিক হাউজবোট, বিকট শব্দে জেনারেটর, উচ্চ শব্দে গানবাজনা, যত্রতত্র পলিথিনসহ নানা বর্জ্যের কারণে সংকটে হাওরের জীববৈচিত্র। টাঙ্গুয়ার হাওরে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ঢোকাই যেখানে নিষেধাজ্ঞা ছিল, সেখানে অবাধে চলছে এসব কর্মকাণ্ড। পাশাপাশি হাওরে উচ্চ শব্দে গান-বাজনায় সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে টাঙ্গুয়ার তীরবর্তী ৮৮টি গ্রামের মানুষ।

এদিকে আইইউসিএন ২০১৫ এর সর্বশেষ রেড ডাটাবুকের তথ্য অনুযায়ী, এই হাওরে ১৩৪ প্রজাতির মাছ, ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২১৯ প্রজাতির দেশি ও বিদেশি পরিযায়ী পাখি, ২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী এবং ১০৪ প্রজাতির উদ্ভিদ থাকলেও বর্তমান সময়ে এগুলো অস্তিত্বহীন।

সেইসঙ্গে সর্বশেষ ২০২৪ সালে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন, ওয়ার্ল্ড বার্ড মনিটরিং ও বাংলাদেশ বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত পাখি শুমারির তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গুয়ার হাওরে ৪৯ প্রজাতির ৪৩ হাজার ৫১৬টি পাখির বিচরণ ছিল। গেল ১০ বছরের পরিসংখ্যানে এই হাওরে ৭৭ শতাংশ দেশি ও পরিযায়ী পাখি এখান আসাই বন্ধ করে দিয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখির সংখ্যা ছিল ৫৯ হাজার ৭৪টি। ২০২০ সালে ৫১ হাজার ৩৬৮টি, ২০১৯ সালে এক লাখ ৪৬ হাজার ৩০টি, ২০১৮ সালে ৫৯ হাজার ৫৪২টি, ২০১৭ সালে ৯১ হাজার ২৩৬টি, ২০১৬ সালে ৪২ হাজার ৫৫৮টি এবং ২০১৫ সালে ৫২ হাজার ২৯৯টি পাখি গণনা করা হয়।

পাখির সংখ্যা কমার বিষয়ে হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর ধ্বংসের জন্য প্রশাসন দায়ী। প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলা ও অবাধে হাওরে হাউজবোট চলাচল করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আজ টাঙ্গুয়ার হাওর ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। পর্যটনের নামে হাওরকে রক্ষা না করে তারা ব্যবসা করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

তবে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হাসেম বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচিয়ে পর্যটনের কথা চিন্তা করতে হবে। সেজন্য আমরা নীতিমালায় কিছু পরিবর্তনের চেষ্টা করছি।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরকে রক্ষা করতে আমরা কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি। এরইমধ্যে হাওরের জীববৈচিত্র্য যারা নষ্ট করছে, উচ্চশব্দে যারা গানবাজনা করছে তাদের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাওরকে রক্ষায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবে।

১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের জানুয়ারি মাসে এই হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রামসার কনভেনশনের আওতায় দেশের ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here