চীন ও ভারতের দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনার পাশাপাশি এবার পানিসম্পদ নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিব্বতে চীনের প্রস্তাবিত মেগা জলবিদ্যুৎ বাঁধের কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে পারে বলে সতর্ক করেছে নয়াদিল্লি। ফলে ভারতও নিজেদের সুরক্ষায় বড় মাপের বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিব্বতের আংসি হিমবাহ থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং জাংবো নদী (ভারতে সিয়াং ও ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত) নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। চীন সীমান্তবর্তী একটি এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। ভারত আশঙ্কা করছে, চীন এ বাঁধকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এই আশঙ্কার কারণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা চীনের যেকোনো পদক্ষেপ মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
২০০০ সালের গোড়া থেকেই ভারত এই নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করে আসছিল। তবে অরুণাচল প্রদেশের বাসিন্দাদের তীব্র বিরোধিতার কারণে প্রকল্পগুলো থেমে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, এসব বাঁধ তাদের গ্রাম ডুবিয়ে দেবে এবং জীবিকা হুমকির মুখে ফেলবে। পরিস্থিতি বদলায় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে, যখন চীন বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা দেয়। এর ফলে ভারত তার প্রতিদ্বন্দ্বীর পানিনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
ভারতের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কোম্পানি এনএইচপিসি ইতোমধ্যেই অরুণাচল প্রদেশের আপার সিয়াং অঞ্চলে সম্ভাব্য বাঁধ স্থাপনের প্রস্তুতি নিয়েছে। ১৪ বিসিএম ধারণক্ষমতার এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে এটি হবে ভারতের সবচেয়ে বড় বাঁধ। এই বাঁধ শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে এবং বন্যা পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে রাখবে। সরকারি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি চীনের বাঁধ কার্যকর হয়, তাহলে ভারতে প্রবাহিত বার্ষিক পানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি চীন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে। এর প্রভাবে গুয়াহাটির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো পানিসংকটে ভুগতে পারে।
এছাড়া ভারত আশঙ্কা করছে, চীন যদি হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেয়, তবে তা ভাটিতে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। তবে প্রস্তাবিত ভারতীয় বাঁধ ন্যূনতম ড্রডাউন স্তরে থাকলে এমন ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এজন্য ভারত বাঁধের ৩০ শতাংশ ধারণক্ষমতা সবসময় খালি রাখার পরিকল্পনা করছে। এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে তৈরি এবং তা ভাটির দেশগুলোর পানি বা পরিবেশের ক্ষতি করবে না। তারা ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা বজায় রাখার কথাও জানিয়েছে।
যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, পানি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এনএইচপিসি রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বাঁধ সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা দুই দেশের কৌশলগত টানাপড়েন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। জলসম্পদ নিয়ে ভবিষ্যতের সংঘাত এড়াতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
তথ্যসূত্র : রয়টার্স

