ইতালিতে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে লিবিয়ার বন্দিশালায় আটকে মুক্তিপণ আদায় করা চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাতে শিবচর উপজেলার পশ্চিম কাকৈর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তানিয়া বেগম ও তার শ্বশুর সালাম মোল্লাকে।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মাদারীপুর সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম আজাদ এ তথ্য জানিয়েছেন।
তানিয়া বেগম মানবপাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত সোবাহান মোল্লার স্ত্রী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, পরিবারের একাধিক সদস্য মিলে গড়ে তুলেছিল এই চক্রের স্থানীয় নেটওয়ার্ক।
এমনই একটি ঘটনার শিকার হয়েছেন মাদারীপুর সদর উপজেলার দুধখালী ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের রুহুল মাতব্বরের ছেলে লিমন মাতুব্বর (২২)। ১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রওনা করানো হয় তাকে। প্রথমে সৌদি আরব, পরে লিবিয়ায় নিয়ে বন্দিশালায় আটকে রেখে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। পরে পরিবারের কাছ থেকে আরো ১২ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এরপর থেকে লিমনের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না স্বজনরা।
ঘটনার পর গত ৭ এপ্রিল লিমনের খালা মুন্নি আক্তার বাদী হয়ে সোবাহান মোল্লা, তার বাবা সালাম মোল্লা, স্ত্রী তানিয়াসহ আটজনের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা করেন।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চক্রটি প্রথমে ইতালিতে বৈধভাবে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙের টাকা নেয়। এরপর বিমানপথে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে পাঠানো হয়। পরে সেখান থেকে অবৈধভাবে লিবিয়ায় নিয়ে একটি বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। সেখানে নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আরো টাকা আদায় করা হয়। টাকা না পেলে শারীরিক নির্যাতন, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
লিমনের খালা মাদারীপুর সদর উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের মুন্নী আক্তার বলেন, “আমার ভাগ্নে লিমনকে এই দালাল চক্র লিবিয়া নিয়ে নির্যাতন করে টাকা নিয়েছে। এখন আমার ভাগ্নে নিখোঁজ। বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তাও জানি না। আমরা এই দালালের বিচার চাই।”
লিমন নিখোঁজের ঘটনায় মামলা হলে র্যাব-৮ এর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তানিয়া বেগম ও সালাম মোল্লাকে সোমবার গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, “এই চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
মানবপাচার নিয়ে কাজ করেন এমন একটি এনজিও রাইট যশোরের মাদারীপুর জেলার সমন্বয়ক বাইজিদ মিয়া বলেন, “বিদেশে যাওয়ার প্রবল আগ্রহ, দালালদের মিথ্যা আশ্বাস এবং গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতার অভাব- এই তিনটি কারণেই মানবপাচার চক্রগুলো সহজেই মানুষকে ফাঁদে ফেলতে পারছে।”
মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, “চক্রগুলোর শিকড় স্থানীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে শুধু গ্রেপ্তার নয়, পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে সমন্বিত অভিযান জরুরি।”