পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় বিপর্যস্ত পার্বত্যাঞ্চল, সেতু ধসে বিচ্ছিন্ন রাঙামাটি–বান্দরবান

0
1
পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় বিপর্যস্ত পার্বত্যাঞ্চল, সেতু ধসে বিচ্ছিন্ন রাঙামাটি–বান্দরবান

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পার্বত্যাঞ্চল। একদিকে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বান্দরবান–রাঙামাটি সড়কের ব্রিজঘাট এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধসে পড়ায় দুই জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে কাপ্তাই নদীর পানি রাজস্থলীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রবেশ করায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল, রাজস্থলীসহ পার্বত্যাঞ্চলের অন্তত ছয়টি উপজেলায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবিক সংকটে পড়েছেন। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

দুর্যোগের শুরু থেকেই রাঙামাটির স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দুর্গত এলাকার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও বন্যাকবলিত অঞ্চল পরিদর্শন করছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রণয়ন করে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।

অন্যদিকে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ ও ত্রাণ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রতিবছর একই ধরনের বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কেন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি?

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ছড়া, নদী ও খালের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়। প্রবল পানির চাপে বান্দরবান–রাঙামাটি সড়কের ব্রিজঘাট এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সেতুর একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। ফলে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে জরুরি রোগী পরিবহন, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ, শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষের যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প সড়ক না থাকায় দুই জেলার মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

এদিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে কাপ্তাই নদীর পানি দ্রুত রাজস্থলী উপজেলার নিম্নাঞ্চলে ঢুকে পড়ে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ৩০০টিরও বেশি বসতবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। অনেক গ্রাম এখনও পানিবন্দি রয়েছে। এক খামারির প্রায় ১ হাজার ৫০০টি মুরগি পানিতে মারা গেছে এবং দুই ব্যক্তির মোট সাতটি গরু ভেসে গেছে।

রাজস্থলীতে মোট নয়টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২৮৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য তিন বেলা খাবার এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল টিম কাজ করছে।

তবে দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক পরিবার এখনও সরকারি সহায়তার বাইরে রয়েছে। দ্রুত নৌযান ও অতিরিক্ত ত্রাণ পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে বাঘাইছড়ি উপজেলায়। প্রায় ৩০টি গ্রামের ২ হাজার ৩৬৬ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তাদের জন্য ১৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বিলাইছড়িতে চারটি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৮৩ জন এবং বরকলে তিনটি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫২ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

রাঙামাটি জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বাঘাইছড়ির জন্য ৪৫ মেট্রিক টন এবং বিলাইছড়ির জন্য ২৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাঘাইছড়িতে ১ হাজার ৪৪টি পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। বিলাইছড়ি ও বরকলেও খাদ্যসহায়তা অব্যাহত রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকারী মানুষের জন্য তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করেছে। এসব দল আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্গত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করছে।

এদিকে রাঙামাটি সদর জোনের উদ্যোগে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ এবং কাউখালীর ঘাগড়া আশ্রয়কেন্দ্রে ৮০টি পরিবারের ২০৪ জন সদস্যের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মগবান ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত ১০০টি পরিবারের মধ্যে ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে।

বরকল উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দুর্গত মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন রাঙামাটি-২৯৯ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্র চালু, খাদ্যশস্য বরাদ্দ, চিকিৎসা দল গঠন এবং উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো। পাহাড়ি এলাকার সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক স্থানে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। অস্থায়ী ত্রাণ কিছুটা স্বস্তি দিলেও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর টেকসই পুনর্নির্মাণ, কার্যকর বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী ও খালের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পাহাড়ি ঢল নিয়ন্ত্রণ এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না।

এদিকে আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি এখনও বহাল রয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করার জন্য স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here