৪৪ বছরের রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষায় মার্তিনেজ

0
1
৪৪ বছরের রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষায় মার্তিনেজ

বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচই ইতিহাস লেখার সুযোগ এনে দেয়। কেউ গোল করে অমর হন, কেউ ট্রফি জিতে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। আবার কেউ নীরবে একের পর এক ম্যাচ খেলে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে যান, যেখানে কয়েক দশক ধরে আর কেউ পা রাখতে পারেননি। এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ এখন দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক সেই জায়গাতেই।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আজ সেমিফাইনালে মাঠে নামলেই ভেঙে যাবে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের ৪৪ বছরের পুরোনো এক রেকর্ড! বিশ্বকাপে দেশটির হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা গোলকিপারের আসনে এককভাবে বসবেন কাতার বিশ্বকাপজয়ী এই নায়ক!

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে মাঠে নামার মধ্য দিয়েই ১৯৭৮ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি উবালদো ফিল্লোলের পাশে জায়গা করে নিয়েছেন মার্তিনেজ। দুজনেরই বিশ্বকাপে ম্যাচসংখ্যা এখন ১৩। তবে আটলান্টায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই সেই যৌথ অবস্থানের ইতি ঘটবে। নতুন রেকর্ডের একমাত্র মালিক হয়ে যাবেন ৩৩ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক।

এই উচ্চতায় পৌঁছানোর পথটাও সহজ ছিল না। প্রথমে পেছনে ফেলতে হয়েছে আর্জেন্টিনার আরেক বিশ্বকাপ নায়ক সার্জিও রোমেরোকে। ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে টানা ১২টি ম্যাচ খেলে দীর্ঘদিন দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন তিনি। এরপর দিবু ছুঁয়ে ফেলেন ফিল্লোলকে, যিনি তিনটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে ১৩ ম্যাচ খেলেছিলেন। এবার সেই কিংবদন্তিকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার অপেক্ষা!

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গোলবার সামলানো গোলকিপারদের তালিকায় বড় বড় নামের অভাব নেই। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী নেরি পুম্পিদো, ইতালিয়া নব্বইয়ের নায়ক সার্জিও গোইকোচিয়া কিংবা আন্তোনিও রোমা-সবারই রয়েছে উজ্জ্বল অধ্যায়। কিন্তু ম্যাচসংখ্যার বিচারে কেউই ফিল্লোল ও মার্তিনেজের ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পারেননি। এই তালিকায় পুম্পিদোর ম্যাচ নয়টি, গোইকোচিয়া ও রোমার ছয়টি, আর রবার্তো আবোন্দানৎসিয়েরি ও দানিয়েল কার্নেভালির পাঁচটি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে এখন পর্যন্ত ১৯ জন গোলকিপার মাঠে নেমেছেন, কিন্তু সবচেয়ে উঁচুতে উঠতে যাচ্ছেন দিবুই!

সংখ্যার এই অর্জন অবশ্য মার্তিনেজের গল্পের কেবল একটি অংশ। কারণ বিশ্বকাপে তার নাম উচ্চারিত হলেই ফিরে আসে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের স্মৃতি। টাইব্রেকারে একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ, ফাইনালে শেষ মুহূর্তের অলৌকিক প্রতিরোধ-এসব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম স্থপতি। সেই আসর থেকেই শুরু হয়েছিল তার কিংবদন্তি হয়ে ওঠার যাত্রা।

চলতি বিশ্বকাপেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন মার্তিনেজ। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ হয়ে তিনি আবারও দলকে নিয়ে এসেছেন সেমিফাইনালে। ফলে শুধু ম্যাচসংখ্যা নয়, পারফরম্যান্সের বিচারে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা গোলকিপারদের আলোচনায়ও এখন নিয়মিত উচ্চারিত হচ্ছে তার নাম। একসময় যেখানে ফিল্লোল ও পুম্পিদোকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ ছিল সেই বিতর্ক, সেখানে এখন দিবু নিজের জায়গা তৈরি করে ফেলেছেন।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি মার্তিনেজের জন্য আরেকটি কারণেও বিশেষ। আর্জেন্টিনার হয়ে খেললেও তার জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে ইংল্যান্ডে। খুব অল্প বয়সে দেশ ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি জমিয়ে দীর্ঘদিন ইংলিশ ফুটবলে নিজেকে গড়ে তুলেছেন তিনি। আর্সেনালের একাডেমি থেকে শুরু করে অ্যাস্টন ভিলার হয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার হয়ে ওঠার পুরো যাত্রাপথই ইংল্যান্ডের মাটিতে।

এবার ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই দেশই দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। যে দেশের ক্লাব ফুটবল তাকে পরিচিতি দিয়েছে, সেই দেশের জাতীয় দলকে হারিয়েই তাকে পৌঁছাতে হবে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে। একদিকে ইতিহাস গড়ার সুযোগ, অন্যদিকে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর একটি-দুই আবেগই এক হয়ে মিশেছে এই সেমিফাইনালে।

তাই আজ বুধবার রাতে আটলান্টার ম্যাচটি কেবল আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের আরেকটি বিশ্বকাপ দ্বৈরথ নয়। এটি এমিলিয়ানো মার্তিনেজের ব্যক্তিগত ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ফাইনালের স্বপ্ন পূরণ হোক বা না হোক, মাঠে নামার মুহূর্তেই তিনি লিখে ফেলবেন নতুন এক রেকর্ড। আর যদি দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে পারেন, তাহলে আর্জেন্টিনার গোলবারে তার কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পটি আরও এক ধাপ পূর্ণতা পাবে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here