গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মানবাধিকার কর্মীদের ঘন ঘন বাংলাদেশ সফরের আহ্বান ড. ইউনূসের

0
68

আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠাতব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ সময়’ অতিক্রম করছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের আরও ঘন ঘন বাংলাদেশ সফরের আহ্বান জানিয়েছেন।

সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের একটি হোটেলে রবার্ট এফ. কেনেডি মানবাধিকার সংস্থার সভাপতি কেরি কেনেডির নেতৃত্বে শীর্ষ মানবাধিকার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠকে তিনি এই আহ্বান জানান। বৈঠকে বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

ড. ইউনূস বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনাদের নিয়মিত বাংলাদেশ সফর করা। প্রত্যেকবার আপনারা এলে ভুলে যাওয়া বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় আসে। শেষ পর্যন্ত আপনারাই জনগণের কণ্ঠস্বর।”

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন, চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার সুরক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন:

  • “আমরা একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছি।”
  • গত বছরের হত্যাকাণ্ড তদন্তে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়কে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, এবং তাদের প্রতিবেদন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ করেছে। এরপর জাতিসংঘ মানবাধিকার মিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা একটি বড় অগ্রগতি।
  • জোরপূর্বক গুম করে ফেলার অভিযোগ তদন্তে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই কমিশন নিয়মিত আপডেট দিচ্ছে এবং “মানুষ ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে সামনে আসছে।”
  • গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কারগুলো অক্টোবরের মধ্যে খসড়া আকারে তৈরি হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো তাতে স্বাক্ষর করবে।

আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, “আমরা চাই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হোক অবাধ ও শান্তিপূর্ণ– এমন নির্বাচন, যা বাংলাদেশে আগে কখনো হয়নি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, এবার বিশেষভাবে নারীদের ভোটদানে উৎসাহিত করতে চান এবং তাদের অংশগ্রহণ উদযাপন করতে চান। “আমাদের লক্ষ্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোটদান প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষকে জানাতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “কিছু আন্তর্জাতিক মহল নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।” তিনি বলেন, কিছু শক্তি রয়েছে যারা নির্বাচন হোক তা চায় না, এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালা হচ্ছে, যার সুবিধাভোগী রয়েছে দেশের ভিতরে ও বাইরে। “তারা সুসংগঠিত– এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়। সামনে কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

ড. ইউনূস অর্থ পাচার প্রতিরোধে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। তিনি আশা করেন মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই বিষয়ে আওয়াজ তুলবে, যেন কোনো ব্যাংক এমন অর্থ লুকিয়ে রাখতে না পারে। তিনি এটিকে “সত্যিকার অর্থেই জনগণের অর্থ” বলে আখ্যায়িত করেন।

বৈঠকে উপস্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা তাসনিম জারা বলেন, বাংলাদেশের তরুণরা কাঠামোগত সংস্কারের জন্য আন্দোলন করেছে, যাতে দেশ আর কখনো সেই পরিস্থিতিতে না ফিরে যায় যা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক জন সিফটন বলেন, “যত বেশি সম্ভব সংস্কার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যেন সংসদ গঠনের পরও তারা এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে।”

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন রবার্ট এফ. কেনেডি মানবাধিকার সংস্থার ক্যাথরিন কুপার, সিভিকাসের মনদীপ তিওয়ানা, ফোর্টিফাই রাইটস-এর ম্যাথিউ স্মিথ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর ক্যারোলিন ন্যাশ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা।