বর্ষা মৌসুমে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতি বছর এডিস মশাবাহিত এ রোগে বহু মানুষ আক্রান্ত হন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই মশার বংশবিস্তার রোধ, মশার কামড় থেকে সুরক্ষা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা এডিস ইজিপ্টি ও এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার কামড়ে ছড়ায়। এ মশা সাধারণত দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে বেশি সক্রিয় থাকে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গাঁটে ব্যথা, বমি, ত্বকে র্যাশ এবং দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ১০টি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো হলো—
প্রথমত, সপ্তাহে অন্তত একদিন ফুলের টব, এসির ট্রে, টায়ার, ডাবের খোসা, বালতি, ড্রাম, ফ্রিজের ট্রে ও ছাদে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে, যাতে এডিস মশা ডিম পাড়তে না পারে।
দ্বিতীয়ত, এডিস মশা দিনের বেলায় বেশি কামড়ায়। তাই শুধু রাতে নয়, দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, বাইরে গেলে ফুলহাতা পোশাক, লম্বা প্যান্ট ও মোজা পরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
চতুর্থত, রাতে ও দিনের বেলায় ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চমত, প্রয়োজন অনুযায়ী মশা নিরোধক ক্রিম, স্প্রে, কয়েল বা বৈদ্যুতিক ভ্যাপোরাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শিশুদের জন্য নিরাপদ পণ্য ব্যবহার করতে হবে।
ষষ্ঠত, হঠাৎ ১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বর, শরীর ব্যথা বা চোখের পেছনে ব্যথা হলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাকের মতো ব্যথানাশক ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সপ্তমত, ডেঙ্গুতে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ ও অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে।
অষ্টমত, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাব কমে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
নবমত, শুধু নিজের ঘর নয়, বাড়ির ছাদ, বারান্দা, গ্যারেজ ও আশপাশের পরিবেশও পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে কোথাও পানি জমে না থাকে।
দশমত, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিবার, প্রতিবেশী ও কর্মস্থলের সবাইকে সচেতন করতে হবে। সম্মিলিতভাবে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে এডিস মশার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকলেও সময়মতো চিকিৎসা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। জ্বর কমাতে সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। তাই জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।