সমঝোতার পথে ইরান-ওমান, ইতিবাচক আলোচনায় তেহরানের কড়া শর্ত

0
2
সমঝোতার পথে ইরান-ওমান, ইতিবাচক আলোচনায় তেহরানের কড়া শর্ত

হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে কূটনৈতিক তৎপরতা। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে একই সময়ে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে—আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও হরমুজ প্রণালী অবিলম্বে খুলে দেওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং যুদ্ধবিরতি, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তন, ক্ষতিপূরণসহ একাধিক শর্ত পূরণ হলেই প্রণালী পুরোপুরি খোলার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

ওমান বলেছে, হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে একটি নৌপথ সুরক্ষিত করার চুক্তির বিষয়ে ইরানের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। যদিও তেহরান সতর্ক করেছে, কোনো চুক্তিতেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি অবিলম্বে পুনরায় চালু হবে না।

শনিবার উভয় পক্ষই ইঙ্গিত দিয়েছে যে আলোচনা অগ্রসর হচ্ছে। তবে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সময়সীমা এখনও অস্পষ্ট। ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাহাজ চলাচলের ওপর হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে, যা এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রণালীটি পুনরায় চালু হওয়া থাকবে “অন্যান্য শর্ত সাপেক্ষে”।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর থেকে তেহরান কার্যত জলপথটি অবরোধ করে রেখেছে। এই পথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রবাহিত হয়।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আলোচনায় প্রণালীটির মধ্য দিয়ে একটি নতুন পথ তৈরির বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি চুক্তির সম্ভাবনার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এই পথের দায়িত্ব উভয় দেশের ওপরই থাকবে এবং আশা করা হচ্ছে, এটি জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি আনবে।

কিন্তু আরাঘচি বলেছেন, সাধারণত ব্যস্ত থাকা এই সামুদ্রিক পথটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া অন্যান্য শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল। এসব শর্তের একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নও তিনি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিরতি এবং যুদ্ধ শেষ করার জন্য আলোচনা এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষের মধ্যে জুনে স্বাক্ষরিত চুক্তির লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইরানের ক্ষতিপূরণ পাওয়া। তেহরানের মতে, এই লঙ্ঘনের দায় যুক্তরাষ্ট্রের।

সেই চুক্তিটি—যাকে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বলা হয়—দ্রুতই ভেস্তে যায় এবং কূটনৈতিক আলোচনাও ব্যর্থ হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েকদিন পরেই পাল্টাপাল্টি হামলা পুনরায় শুরু হয়।

এর বাইরে, ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মোহাম্মদ বাকের যুলকাদর আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার আচরণ “সংশোধন” না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা হবে না।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ছয়টি দাবি পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্তি দেওয়া।

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী ২০ জুলাই থেকে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপর আরেকটি অবরোধ আরোপ করেছে।

এই সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি “শীঘ্রই হতে পারে”। কিন্তু শনিবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে আরও বেশি সংশয়ী মনে হয়েছে। তিনি ফক্স নিউজকে বলেন, অগ্রগতি হলেও এখনও অনেক কাজ বাকি আছে।

তিনি বলেন, “আমরা আসলে খেলার মাঝপথে আছি। এই বিষয়টি এখনও শেষ হয়নি।”

ভ্যান্স আরও বলেন, “আমরা আমেরিকান জনগণের জন্য সর্বোত্তম ফলাফল নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক [এবং] সামরিক বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করছি।”

এছাড়াও, তিনি দাবি করেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে উপসাগর থেকে যে পরিমাণ তেল উত্তোলন করা হতো, ঠিক সেই পরিমাণই উত্তোলন করা হবে। যদিও তিনি এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

তিনি আরও বলেন, “আমরা এখন মূলত একটি চলাচল ব্যবস্থা তৈরির বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি, যাতে জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারে।”

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মতবিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, প্রণালীটি অতিক্রম করতে ইচ্ছুক জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়ে ইরানের কথিত হুমকি।

রয়টার্স এর আগে একজন ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, তেহরান এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে পণ্যের মূল্যের ৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দাবি করছে।

ভ্যান্স এই প্রতিবেদনগুলোকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ইরানিরা আমাদের জানিয়েছে যে হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।

প্রণালীতে জাহাজে হামলার বিরুদ্ধে ওমানের সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) শনিবার জানিয়েছে, ইরান তাদের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি অ্যাডনকের একটি ট্যাংকারকে প্রণালী অতিক্রম করার সময় লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

ইউএই-এর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, একটি “শত্রুভাবাপন্ন ইরানি হামলায়” অ্যাডনকের একটি ট্যাংকার “ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে” আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

শনিবার পরে, ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) সংস্থাও জানিয়েছে, ওমানের উপকূলের কাছে একটি জাহাজ “একটি অজ্ঞাত প্রক্ষেপণ বস্তুর” আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে “আগুন লেগেছিল, যা নিভিয়ে ফেলা হয়েছে”, তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

ইউকেএমটিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উল্লিখিত একই জাহাজের কথা উল্লেখ করছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

সূত্র- বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here