মুন্সিগঞ্জের একসময়ের দাপুটে পুলিশ সুপার মো: জায়েদুল আলম পিপিএম। হরগঙ্গায় অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে ছাত্রলীগ সভাপতির কক্ষ থেকে বিপুল পরিমান অস্ত্র উদ্ধার সহ বিভিন্ন পদক্ষেপে ছিলেন আলোচিত, তেমনি তৎকালীন সরকার বিরোধীদের দমন-পীড়নেও নানা সময় উঠেছে সমালোচনা। এবার সাবেক এই পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে ২০১৮সালের বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনে তৎপরতা ও রাতে বেলা কেন্দ্রের দরজা না খোলায় হরগঙ্গা এক শিক্ষককে গুলি করার মত ভয়াবহ কথা ভাবার বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি হরগঙ্গা কলেজের শিক্ষক আব্দুল কাদের সাথে সে ঘটনা নিয়ে বৃহস্পতিবার (৩জুলাই) রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছে প্রতিষ্ঠানের আরেক শিক্ষক মুন্সী সিরাজুল হক। সে পোস্টেই নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞার কথা মন্তব্যে জানিয়েছে শিক্ষক আব্দুল কাদের। এরমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মুন্সী সিরাজুল হক লিখেছেন, “১৮ সালের রাতের ভোটে যথাযথভাবে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার সহকর্মী আব্দুল কাদের সোহাগের কি অবস্থা করেছিলো পুলিশ, প্রশাসন ও পতিত সরকারের দোসরেরা সেটা খুব কাছে থেকে দেখেছি। আব্দুল কাদেরের পক্ষ হয়ে মুন্সীগঞ্জের তৎকালীন পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।
পুলিশ সুপারের সেই ভয়াবহ কথাটা আজো কানে বাঁজে, সে বলেছিলো, অন্য কেউ হলে ওকে গুলি করতে নির্দেশ দিতাম কিন্তু হরগঙ্গা কলেজের শিক্ষক হওয়াতে শুধু শারীরিক নির্যাতনের উপর দিয়ে গেছে। সেদিনের সেই মিটিং এ আরো অনেক ভয়াবহ কথা শুনতে হয়েছিলো।
আব্দুল কাদের সেদিন ন্যায়বিচার তো পায়নি, বরং তার চাকুরী চলে যাবার উপক্রম হয়েছিলো অর্পিত দায়ীত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতে গিয়ে।”
এদিকে এপোস্টের মন্তব্যের অপশনে ভোক্তভোগী শিক্ষক আব্দুল কাদের লিখেন, ” বিগত স্বৈরাচারী, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় ২০১৮ এর রাতের যে অবৈধ নির্বাচন হয়েছিল, সে অবৈধ নির্বাচনে সরকারি আদেশে আমাকে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব দিয়ে মিরকাদিম পৌরসভা মুন্সিগঞ্জে পাঠানো হয়েছিল। রাতের বেলা ভোট কেন্দ্রের গেটের তালা খুলতে অস্বীকৃতি ও অবৈধভাবে ভোট প্রদানে অস্বীকৃতি জানাই। রাতভর তৎকালীন সহকারী রিটার্নিং অফিসার, রিটার্নিং অফিসার, এডিএম, অতিরিক্ত পুলিশ, সুপার পুলিশ, অত্র এলাকার মেয়র, থানার ওসি, ছাত্রলীগ, আওয়ামী রাজনীতির সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে লোক মাধ্যমে এবং আমার মুঠোফোন রাতভর হুমকি প্রদান করে। তাতেও আমি অন্যায়ের সাথে আপস করিনি।
নির্বাচনের দিন ৩০/১২/২০১৮ তারিখ সারাদিন আমাকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে নির্যাতন করলেও নেককারজনক ঘটনা ঘটে বিকাল ৫ টার পরে। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার ইউএনও অফিস যা কিনা তখন সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় ছিল সেখানে যখন নির্বাচনী জিনিসপত্র বুঝিয়ে দিয়ে বের হতে থাকি তখন প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১২ থেকে ১৫ জন আমার উপর হামলা করে। তাদের এই হামলা ছিল আমাকে মেরে ফেলার হামলা। আমার মাথা, পেট ও স্পর্শকাতর স্থানে অমানবিকভাবে কিল, ঘুষা ও লাথি মারতে থাকে। আমার যখন জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হয় তখন তারা আমার তিনটি মোবাইল ফোন আমার সাথে থাকা ২০ হাজার টাকা নিয়ে যায় আর বলতে থাকে স্যার বলেছে করে শেষ করে ফেলতে । তারা চলে গেলে কয়েকজন ধরাধরি করে আমাকে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের রুমে নিয়ে যায়, আমি তাকে বলি আপনি এবং আপনারা আমাকে পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছেন। তিনি অন্য দিকে তাকিয়ে বলেন, ওকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
আমাকে হাসপাতালে আনা হলেও এখানেও তাদের লোক ছিল। কানের কাছে এসে বলতেছিল এখানে কাউকে কিছু বললে আমার অনেক সমস্যা হবে। এর মধ্যে আমার কয়েকজন সহকর্মী এসে পরে। ডাক্তার আমাকে পেইন কিলার দিয়ে বলে আমাকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে, মাথায় ইন্টারনাল ব্লিডিং হয়েছে কিনা তা চেক করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ওই রাতেই আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং চিকিৎসা নেই।
যখন একটু সুস্থ হয়ে আসি তখন আমার সহকর্মী Shirajul Haque Monir স্যার এবং Nazir Ahmmad স্যার কে সাথে নিয়ে তৎকালীন মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলমের সাথে দেখা করতে যাই।
সেদিনকার ঘটনা ব্যাখ্যা করা অমানবিক।
নির্বাচনের দিন আমার সাথে যে কনস্টেবল দেওয়া হয়েছিল সেই কনস্টেবল নাকি আমাকে গুলি করে মেরেই ফেলতে চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম আমার তিনটা মোবাইল ফোন যেন ফেরত দেওয়া হয়।
সে রেগে গিয়ে বলেছিল, আমার কত বড় স্পর্ধা আমি আবার মোবাইল ফেরত চাই। আমি বেঁচে আছি তাই বেশি।
এবং আমার নামে ফাইল খোলা হবে এবং আমার চাকরি নিয়েও পরবর্তীতে ঝামেলা হতে পারে এই হুমকিও প্রদান করেন।
আজ অনেকদিন পরে স্যার আবার ওইসব দুঃখময় স্মৃতি মনে করিয়ে দিলেন। আমি জীবনে সাহস করে ফেসবুকে এসব কথাগুলো লিখব কখনো ভাবতে পারিনি।”
এদিকে পোস্টটি ঘিরে স্খানীয় ছাত্রমহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকেই এখন সাবেক পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এবিষয়ে সাবেক পুলিশ সুপার জায়েদুল আলমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।
পুলিশ উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, ৫আগষ্টের পর লাপাত্তা একসময়ের দাপুটে পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম।


