আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি এক সপ্তাহের সফরে বৃহস্পতিবার ভারতে পৌঁছেছেন। ২০২১ সালে পশ্চিমা মদদপুষ্ট আশরাফ গনি সরকারকে হটিয়ে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর এটাই সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির প্রথম ভারত সফর। আট দিনের সফরে মুত্তাকি দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করবেন।
ভারত সফরে এসে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি।
আফগানিস্তানের মাটিতে কোনো ‘বিদেশি’ শক্তির ‘নিয়ন্ত্রণ’ মেনে নেয়া হবে না। ভারত সফরে এসে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।
বারগাম বিমান ঘাঁটির আবার মার্কিন নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেয়ার যে আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সেই প্রসঙ্গে এই মন্তব্য করেছেন আমির খান মুত্তাকি।
ভারত সফরের দ্বিতীয় দিনে দিল্লির আফগান দূতাবাসে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।
তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই প্রথমবার ভারত সফরে এসেছেন। এর জন্য জাতিসংঘের বিশেষ ছাড়ের প্রয়োজন পড়েছে, কারণ ‘নিষিদ্ধ সন্ত্রাসীদের’ তালিকায় রয়েছেন মুত্তাকি।
আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় ফেরার পর কাবুলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের সমীকরণে বদল এসেছিল। তালেবান সরকারের সঙ্গে ‘সন্তর্পণে দূরত্ব’ তৈরি করতে দেখা গিয়েছিল ভারতকে।
সেই দৃশ্যও সম্প্রতি বদলেছে। সম্প্রতি দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একাধিকবার যোগাযোগ হয়েছে। তারপরই মি. মুত্তাকির এই ভারত সফর।
সফরের দ্বিতীয় দিনেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে। কাবুলে ভারতের টেকনিক্যাল মিশনকে দূতাবাসের মর্যাদায় উন্নীত করার ঘোষণা করেছেন জয়শঙ্কর।
পরে শুক্রবার বিকেলে বাছাই করা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন আমির খান মুস্তাকি। তবে সেই সংবাদ সম্মেলনে শুধু পুরুষ সাংবাদিকদেরই উপস্থিতি ছিল। তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
প্রসঙ্গত, তালেবান সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি ভারত।
পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি
ভারতের মাটিতে বসে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলেন মুত্তাকি। সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের ইতিমধ্যে সম্পর্কের অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের রাজধানী থেকেই পাকিস্তানকে কিছুটা হুঁশিয়ারির সুরেই ‘খেলা বন্ধ’ করার বার্তা দিয়েছেন তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, আফগানদের সাহস পরীক্ষা করার কথা যেন কোনোমতেই না ভাবা হয়। এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর প্রসঙ্গও টেনে আনেন।
কাবুলে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশে বলেন, ‘সীমান্তের কাছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে হামলা হয়েছে। পাকিস্তানের এই কাজকে ভুল বলে আমরা মনে করি। ৪০ বছর পর আফগানিস্তানে শান্তি ও অগ্রগতি হয়েছে। আফগানদের সাহস পরীক্ষা করা উচিত নয়। যদি কেউ তা করতে চায়, তাহলে তাদের উচিৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোকে জিজ্ঞাসা করা, যাতে তারাই ব্যাখ্যা করে দিতে পারে যে আফগানিস্তানের সঙ্গে খেললে ভালো হয় না।’
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বার্তা
সম্প্রতি বাগরাম বিমান ঘাঁটিকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আফগানিস্তান দৃঢ়ভাবে এর বিরোধিতা করে। ভারত সফরের দ্বিতীয় দিনে দিল্লিতে বসেই সেই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা দিয়েছেন মুত্তাকি।
তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তান ইতিমধ্যে এই সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছে যে আমরা সেখানে কখনোই কোনো সামরিক বাহিনীকে গ্রহণ করিনি এবং কখনো তা করব না। আফগানিস্তান একটা সার্বভৌম দেশ এবং সেটাই থাকবে। আপনি যদি সম্পর্ক চান তাহলে একটি কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন, কিন্তু সামরিক পোশাক পরা কাউকে গ্রহণ করি না আমরা।’
কাবুলে ভারতীয় দূতাবাস
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে মুত্তাকির শুক্রবার বৈঠকের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেন আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে দূতাবাস ফের চালু করা হবে।
এ বিষয়ে মুত্তাকি বলেন, ‘কাবুলে ভারতের টেকনিক্যাল মিশনকে ভারতীয় দূতাবাসের স্তরে উন্নীত করার ঘোষণা করতে পেরে আমি আনন্দিত।’
ভারত-আফগান ঘনিষ্ঠ বন্ধু!
আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে জয়শঙ্কর বলেন,‘ভারত ও আফগানিস্তানের সম্পর্কের জন্য আপনার এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
এছাড়া বৈঠকে ভারতকে আফগানিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে সম্বোধন করেছেন আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মুত্তাকী বলেন, ‘আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের সময় ভারতই প্রথম পাশে দাঁড়িয়েছিল। আফগানিস্তান ভারতকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দেখে। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বাণিজ্য এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ক চাই।’
সাংবাদিক সম্মেলনের সময় তাকে চাবাহার বন্দর নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চাবাহার একটা চমৎকার বাণিজ্য পথ। এই পথে আসা সমস্ত বাধাকে দূর করার জন্য ভারত ও আফগানিস্তানের একসঙ্গে কাজ করা উচিৎ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে। তাই উভয় দেশকে এই বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। এই রুট দুই দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিলে আফগানিস্তানের বাসিন্দাদের জন্য নতুন ভিসা ব্যবস্থা চালু করেছে নয়াদিল্লি। এর আওতায় চিকিৎসা, ব্যবসা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও বেশি সংখ্যক ভিসা দেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে দেশটিতে খাদ্য সহায়তাও দিচ্ছে ভারত।
পাশাপাশি আফগানিস্তানকে ২০টি অ্যাম্বুলেন্স দেবে ভারত, যার মধ্যে পাঁচটা শুক্রবারই দেয়া হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখারও ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সূত্র : বিবিসি বাংলা।

