জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় মামার বাসা থেকে ডিজিএফআই তুলে নিয়ে গোপন সেফ হাউসে আটকে রেখে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করেছে—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেওয়া জবানবন্দিতে এমন অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ।
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২২তম সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি দেন।
হাসনাত জানান, গত বছরের ১৭ জুলাই সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় মামার বাসায় থাকাকালে তাকে এবং এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে তুলে নেয় ডিজিএফআই। তারা যেতে অস্বীকৃতি জানালে পরিবারসহ ক্ষতির হুমকি দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য, সেদিন রাতেই তাদের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মা’য় নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে তৎকালীন তিন মন্ত্রী—আনিসুল হক, মোহাম্মদ এ আরাফাত ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল—পদ্মায় প্রবেশ করেন। ডিজিএফআই সদস্যরা ওই তিন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসার জন্য বারবার চাপ দেন।
হাসনাত বলেন, “এক ঘণ্টারও বেশি সময় নানাভাবে প্রলোভন, ভীতি ও চাপ দিয়ে আমাদের শুধু বৈঠকে বসতে বলা হয়। কিন্তু অন্য সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদের সঙ্গে কথা না বলে আমরা কোনো বৈঠকে বসতে অস্বীকৃতি জানাই।”
তিনি জানান, বৈঠকে না বসায় ডিজিএফআই ক্ষুব্ধ হয়ে সেদিন রাতেই তাদের বাসায় না ফিরিয়ে মৎস্য ভবন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মাঝামাঝি একটি ‘সেফ হাউসে’ নিয়ে যায়। বাইরে থেকে সেটি পরিত্যক্ত বাড়ি মনে হলেও ভেতরে আধুনিক সরঞ্জাম ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
হাসনাত দাবি করেন, ১৮ জুলাই ফজরের আজানের সময় এক সেনা কর্মকর্তা তাকে বলেন, তিনি ২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর বিএনপির ‘লাখো জনতার’ সমাবেশ ১০ মিনিটে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনও একইভাবে দমন করা হবে বলে হুমকি দেন।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় অন্য সমন্বয়কদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না উল্লেখ করে তিনি জানান, ডিজিএফআই সদস্যরা তার মোবাইল ব্যবহার করে সমন্বয়ক হাসিবের অবস্থান জেনে তাকে চানখাঁরপুল থেকে তুলে আনে এবং তাদের সঙ্গে আটকে রাখে। সেখানে তাদের নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।
হাসনাতের বক্তব্য, সমন্বয়ক হাসিব মাদ্রাসাছাত্র হওয়ায় এবং তার বোনও মাদ্রাসার ছাত্রী হওয়ায় তাকে ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। নিজের ফোন দিয়ে হাসিবের অবস্থান জানাতে বাধ্য হওয়ায় তার মনে ‘অপরাধবোধ’ সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
প্রসঙ্গত, আবু সাঈদ হত্যা মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ ৩০ জন আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক উপাচার্যসহ ২৪ জন পলাতক এবং ছয়জন কারাগারে আছেন—রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।