কৃষি বিপ্লবের নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

0
22
কৃষি বিপ্লবের নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো কৃষি। আর সেই কৃষির কারিগর কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন ও ভাগ্যবদল ছাড়া একটি উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা অসম্ভব। মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের পুণ্যলগ্নে টাঙ্গাইলের মাটি থেকে এই ধ্রুব সত্যটিই পুনরায় দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, কৃষক ভালো থাকলে সমগ্র বাংলাদেশ ভালো থাকবে। পহেলা বৈশাখের আনন্দ আর নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সংকল্প নিয়ে এদিন টাঙ্গাইল পরিণত হয়েছিল উৎসবের নগরীতে।

শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার কৃষকের সামনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির ঐতিহাসিক উদ্বোধন করেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের কৃষকদের সরাসরি সরকারি সুবিধার আওতায় আনার এক আধুনিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করল বর্তমান সরকার।

প্রধানমন্ত্রী দুপুর সোয়া ১২টার দিকে প্রতীকীভাবে টাঙ্গাইলের ১৫ জন কিষান, কিষানির হাতে ডিজিটাল ‘কৃষক কার্ড’ ও গাছের চারা তুলে দিয়ে এই মহতী প্রকল্পের শুভ সূচনা করেন। বক্তৃতার শুরুতেই তিনি কৃষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আপনাদের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্যই হলো কৃষককে আত্মনির্ভরশীল ও সচ্ছল হিসেবে গড়ে তোলা। কৃষক সমাজ এ দেশের মেরুদণ্ড। তারা যদি হাসে, তবেই বাংলাদেশ হাসবে।

প্রধানমন্ত্রী বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন যে, এই কৃষক কার্ড শুধুমাত্র একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং এটি কৃষকের উন্নয়নের চাবিকাঠি। এই কার্ডের মাধ্যমে সরকার সরাসরি কৃষকের হাতে ১০টি মৌলিক সুবিধা পৌঁছে দেবে। এর ফলে সার, বীজ, কীটনাশক থেকে শুরু করে সেচ সুবিধা ও সরাসরি ভর্তুকি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হবে। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই ১০টি সুবিধার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষকেরা তাদের আর্থ, সামাজিক অবস্থান আমূল পরিবর্তন করতে সক্ষম হবেন।

রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে যে ব্যবধান থাকে, তা ঘোচানোর নজির স্থাপন করেছে বর্তমান সরকার, এমনটিই দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্বাচনের পূর্বে আমরা কথা দিয়েছিলাম যে কৃষকদের পাশে দাঁড়াব। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা প্রথম সপ্তাহেই কাজ শুরু করেছি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ছিল, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সেই ঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিয়েছে। এর ফলে সারা দেশের প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমরা টাঙ্গাইলে মাত্র ২২ হাজার কৃষকের হাতে কার্ড পৌঁছে দিচ্ছি, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য অনেক বড়। বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষক রয়েছেন। ইনশাআল্লাহ, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা দেশের প্রতিটি কৃষকের কাছে এই ‘কৃষক কার্ড’ পৌঁছে দেব।

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখের দিনটিকে কেন এই কর্মসূচির জন্য বেছে নেওয়া হলো, তার এক চমৎকার ব্যাখ্যা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ মূলত বাংলাদেশের কৃষিজীবী মানুষেরই উৎসব। খাজনা আদায়, হালখাতা খোলা আর নতুন ফসলের স্বপ্ন, সবকিছুই আবর্তিত হয় কৃষিকে কেন্দ্র করে।

কৃষকের সেই চিরায়ত ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানিয়েই পহেলা বৈশাখের দিনে এই মহতী উদ্যোগের যাত্রা শুরু করা হয়েছে। তিনি উপস্থিত জনতাকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, নতুন বছরে নতুন খাতা খোলার মতো করেই কৃষকদের জীবনের দৈন্যদশা দূর করতে আমরা এই নতুন ডিজিটাল খাতা বা ‘কৃষক কার্ড’ নিয়ে এসেছি।

বক্তৃতার এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানই প্রথম অনুধাবন করেছিলেন যে, কৃষির উন্নয়ন ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। সে সময় তিনি দেশব্যাপী ‘খাল খনন কর্মসূচি’র মাধ্যমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। বর্তমান সরকার সেই আদর্শকে ধারণ করে কৃষিকে সেচ সুবিধার আওতায় আনতে বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম খাল খননের কথা। আজ কাজ শুরু হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে আমরা সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। এর মাধ্যমে পানির অভাব দূর হবে, সেচ খরচ কমবে এবং ফসলের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামের কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী টাঙ্গাইল শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য ‘কৃষি মেলা’র উদ্বোধন করেন। মেলায় বিভিন্ন স্টলে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, উন্নত জাতের বীজ এবং জৈব সার প্রদর্শিত হচ্ছিল।

প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি স্টল ঘুরে দেখেন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। কৃষকরা যেন সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক ও লাভজনক চাষাবাদে অভ্যস্ত হয়, সে বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ জিয়াউকুন সি এবং কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ। অনুষ্ঠানে কৃষকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন আবুল হোসেন ও কিষানি জুলেখা আক্তার, যারা প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে বর্ণনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর টাঙ্গাইলবাসীর জন্য কেবল উৎসবের বার্তা নয়, বরং সামগ্রিক কৃষি খাতের আমূল পরিবর্তনের এক দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার নিয়ে এসেছে। ‘কৃষক কার্ড’ এবং ‘খাল খনন কর্মসূচি’র মতো উদ্যোগগুলো যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চার করবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, কৃষকের সচ্ছলতাই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রকৃত পরিচয়। টাঙ্গাইলের এই জনসভা থেকে উচ্চারিত শব্দগুলো এখন সারা দেশের কৃষকের মনে নতুন করে আশার আলো জ্বালাচ্ছে, একটি সমৃদ্ধ ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশের স্বপ্ন।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here