পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় চালুর ঘোষণা ট্রাম্পের, বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

0
82

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে পারমাণবিক পরীক্ষা চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, অন্যান্য দেশ যখন নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রও “সমতার ভিত্তিতে” পরীক্ষায় ফিরবে।

“আমি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিভাগকে (সাবেক প্রতিরক্ষা দপ্তর) নির্দেশ দিয়েছি, অবিলম্বে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা শুরু করতে,” — লিখেছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরও হোয়াইট হাউস কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে এখনো পরিষ্কার নয়—এটি কি পারমাণবিক অস্ত্র বহনের সক্ষমতা যাচাই (যেমন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা), নাকি আসল পারমাণবিক বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষা।

১৯৯০-এর দশকের পর থেকে কেবল উত্তর কোরিয়াই পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে; তাদের সর্বশেষ পরীক্ষা হয়েছিল ২০১৭ সালে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের এই ঘোষণা বিশ্বে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার আগুন আরও উসকে দিতে পারে।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর ফেলো জেমি ওয়াং মন্তব্য করেন— “উত্তর কোরিয়া ছাড়া কেউ কয়েক দশক ধরে পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়নি। এই ঘোষণা অন্য দেশগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক মুহূর্ত।”

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যা “সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা” ডেকে আনতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান ও ইরান-ইসরায়েল সংঘাত, এবং তাইওয়ান-চীন উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতি এমনিতেই অস্থিতিশীল।

ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ থাকলেও তেহরান তা অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল কখনো প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণের চুক্তির মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নবায়ন না হলে বিশ্ব ‘অস্ত্র নিয়ন্ত্রণহীন যুগে’ প্রবেশ করবে।

রাশিয়া সম্প্রতি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম বলে দাবি করেছে ক্রেমলিন। চীনও জানিয়েছে, তারা আশা করে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলবে।

বিশ্লেষকদের সতর্ক বার্তা
ওয়াশিংটনের আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন-এর নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল ক্যাম্পবেল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরু করা হবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার দিক থেকে এক ঐতিহাসিক ভুল।” তার মতে, এটি চীন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে “এক বিপজ্জনক ত্রিপাক্ষিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা” উস্কে দেবে।

ফেডারেশন অফ আমেরিকান সায়েন্টিস্টস-এর পরিচালক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেন, “গত পাঁচ বছরে পারমাণবিক ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এই ঘোষণা সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগজনক।” শেষবার পরীক্ষা হয়েছিল ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় ১৯৯২ সালে, নেভাডা অঙ্গরাজ্যের ভূগর্ভে।

বিশ্লেষকদের মতে, সেই স্থানটি আবার প্রস্তুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কমপক্ষে ৩৬ মাস সময় লাগবে। বর্তমানে দেশটি কম্পিউটার সিমুলেশন ও অ-বিস্ফোরক পরীক্ষার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র যাচাই করে থাকে।

রাজনৈতিক বার্তা না প্রযুক্তিগত প্রয়োজন?
রক্ষণশীল থিংক ট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন-এর গবেষক রবার্ট পিটার্স মনে করেন, “এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া।” তিনি বলেন, “কখনও কখনও একজন প্রেসিডেন্ট তার শক্তি প্রদর্শনের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন। তা তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প হোন বা অন্য কেউ।”

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। একই বছর আগস্টে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে বোমা হামলা চালিয়ে ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র দেশ হিসেবে যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র।

আজ প্রায় ৮০ বছর পর, ট্রাম্পের এই ঘোষণা আবারও সেই পুরোনো ভয়াবহ স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেছে—বিশ্ব কি নতুন এক পারমাণবিক যুগের দ্বারপ্রান্তে?