দিল্লি বিস্ফোরণের পর কাশ্মীরে ভারতের ব্যাপক অভিযান, চলছে গণগ্রেফতার

0
36

এই সপ্তাহে নয়া দিল্লিতে প্রাণঘাতী গাড়ি বিস্ফোরণের ‘তদন্তের’ অংশ হিসেবে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী, যেখানে শত শত মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে, সন্ত্রাসবিরোধী তদন্তের আড়ালে কাশ্মীরি মুসলমানদের ভয় দেখানো ও ফাঁসানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।

গত সোমবার নয়া দিল্লির ঐতিহাসিক লাল কেল্লার কাছে ভয়াবহ গাড়ি বিস্ফোরণে অন্তত আটজন নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হন। ভারত সরকার ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে উল্লেখ করে দ্রুত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভা এক বিবৃতিতে বলেছে, “দেশ জাতি-বিরোধী শক্তিগুলোর গাড়ি বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটানো এক জঘন্য সন্ত্রাসী ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। তদন্ত যেন সর্বোচ্চ দ্রুততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন হয়, যাতে অপরাধী, তাদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়।”

বিস্ফোরণের পর থেকেই কাশ্মীরে হাজারের বেশি মানুষকে আটক এবং শত শত বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। অধিকাংশ তল্লাশি চালানো হয় এমন পরিবারগুলোর বাড়িতে, যাদের সদস্যরা ইতিমধ্যে ‘ভারত-বিরোধী কর্মী’ হিসেবে গ্রেফতার বা চিহ্নিত।

এদিকে, বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা আগেই ফরিদাবাদ শহরে (নয়া দিল্লির কাছাকাছি) সাতজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ, যাদের মধ্যে তিনজন কাশ্মীরি ডাক্তার। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও বোমা তৈরির উপকরণ জব্দ করার দাবি করা হয়। ভারতীয় গণমাধ্যম দ্রুত খবর ছড়ায় যে, এই ডাক্তারদের বিস্ফোরণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকতে পারে, যদিও পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

সূত্রমতে, তদন্তের সূত্রপাত হয় ১৯ অক্টোবর শ্রীনগরের একটি এলাকায় ভারত-বিরোধী পোস্টার লাগানোর ঘটনায়। সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করে প্রথমে তিনজনকে আটক করা হয়, পরবর্তীতে আরও কয়েকজন কাশ্মীরি নাগরিক ও দুইজন ডাক্তারকে গ্রেফতার করা হয়।

ফরিদাবাদের একটি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ডাঃ উমর এই মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। তার শ্যালিকা শাগুফতা জান জানিয়েছেন, গত শুক্রবার থেকে পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।

“তিনি শুক্রবার ফোন করেছিলেন, আমি বলেছিলাম বাড়ি ফিরে আসুন। তিনি বলেছিলেন, তিন দিন পর আসবেন— সেটাই ছিল শেষ কথা,” বলেন শাগুফতা। পরদিন রাতেই পুলিশ তার মা ও দুই ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়।

কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি তদন্তের নামে কাশ্মীরিদের ভয় দেখানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, “এখনও কারও অপরাধ প্রমাণিত হয়নি, তবুও পুলিশ সন্দেহের ভিত্তিতে পরিবারের সদস্যদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কাশ্মীরে ভারতীয় পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মিডিয়ায় কাশ্মীরি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাচারণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
এর ফলে দেশজুড়ে কাশ্মীরি শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনাও বাড়ছে।

পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই কাশ্মীরের পূর্ণ মালিকানা দাবি করে, তবে অঞ্চলটি দুই দেশের মধ্যে বিভক্ত। ১৯৯৯ সালে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়, যেখানে অধিকাংশ মুসলিম বাসিন্দা স্বাধীনতা বা পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে।

ভারত অভিযোগ করে, পাকিস্তান বিদ্রোহে ইন্ধন দিচ্ছে— যদিও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করে বলছে, তারা কাশ্মীরিদের শুধু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেয়।

প্রায় আট দশক ধরে চলা এই সংঘাতে সহস্রাধিক বেসামরিক, যোদ্ধা ও ভারতীয় সেনা প্রাণ হারিয়েছে। জাতিসংঘ কাশ্মীর ইস্যুতে গণভোট আয়োজনের পক্ষে একাধিক প্রস্তাব পাস করেছে, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড