ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার ভাতুড়িয়া এলাকায় থেকে উদ্ধার হওয়া অর্ধদগ্ধ এক নারীর মরদেহ ঘিরে সৃষ্টি হওয়া রহস্যের জট খুলেছে পুলিশ। স্বর্ণের কলসি ও স্বর্ণের পুতুল পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর পয়ত্রিশ বছর বয়সী গৃহবধূ নাসিমা বেগমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় স্থানীয় তান্ত্রিক ও কবিরাজ মো. সামশুল হককে (৫৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) রাত সাড়ে ৮টায় ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন।
তিনি জানান, সোমবার সকাল ৭টার দিকে ভাতুড়িয়া ইউনিয়নের একটি নির্জন স্থানে অর্ধদগ্ধ অবস্থায় এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করে। প্রাথমিকভাবে মরদেহের গলায় রশির দাগ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে পোড়ার চিহ্ন দেখতে পান তদন্তকারীরা।
মরদেহ শনাক্ত হওয়ার পর পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেনের নির্দেশনায় জেলা পুলিশের একাধিক টিম সমন্বিতভাবে তদন্ত শুরু করে। শুরুতে হত্যাকাণ্ডটি প্রায় ক্লুলেস মনে হলেও নিহতের ১২ বছর বয়সী মেয়ের দেওয়া তথ্য, অর্থ লেনদেনের সূত্র এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্তকারীরা দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়ে যান।
তদন্তে বেরিয়ে আসে, হরিপুর উপজেলার টেঙরিয়া মকবুলপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সামশুল হক দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে তান্ত্রিক ও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে নাসিমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি নাসিমাকে স্বর্ণের কলসি ও স্বর্ণের পুতুল পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে মোটা অঙ্কের টাকা গ্রহণ করেন।
পুলিশের দাবি, প্রতিশ্রুত স্বর্ণ না পাওয়ায় সম্প্রতি নাসিমা তার কাছে বারবার টাকা ফেরত অথবা স্বর্ণ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। এতে বিপাকে পড়েন সামশুল হক। একপর্যায়ে তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে নাসিমাকে নির্জন স্থানে ডেকে নেন। সেখানে গুপ্তধন উদ্ধারের আচার এবং তন্ত্র-মন্ত্রের বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার কথা বলে নাসিমাকে বসানো হয়। সুযোগ বুঝে তার গলায় দড়ি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে হত্যার প্রমাণ মুছে ফেলতে এবং ঘটনাটিকে অন্যদিকে প্রবাহিত করতে মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। তবে আগুন পুরো শরীরে ছড়িয়ে না পড়ায় মরদেহের কিছু অংশ অক্ষত থাকে, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার দিনই সন্দেহভাজন সামশুল হককে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া, নিহতের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ৩০ হাজার টাকাও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে সামশুল হকের বিরুদ্ধে অলৌকিক শক্তি, গুপ্তধন ও তান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের একাধিক অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তার সঙ্গে অন্য কোনো প্রতারণা চক্র বা সহযোগী জড়িত আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গ্রেপ্তার সামশুল হক হরিপুর উপজেলার টেঙরিয়া মকবুলপাড়া গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে। নিহত নাসিমা বেহগম (৩৫) রানীশংকৈল উপজেলার রাউতনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহর স্ত্রী।