সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাইবার স্পেসে বিভিন্ন ধরনের গুজব, মানহানিকর বা ভুয়া কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ভিডিও, অডিও ও ছবি তৈরির প্রতিরোধে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার ।
সোমবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার রোধে সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে এ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের একটি প্রশ্নের জবাবে এই তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফরমগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার বিধানও আইনে আনা হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ রহিত করে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে।
পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি আইন আকারে পাশ হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য ছড়ানো ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির পরিমাণ বাড়লেও নতুন এই আইনে এই ধরনের অপরাধের শাস্তির বিধান নেই। যে কারণে এসব অপরাধ বন্ধ করা যাচ্ছে না।
অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে এই আইনটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আইন সংশোধন নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা
গত রবিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। সোমবার সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি, বট নেটওয়ার্ক, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট, নারী ও শিশুদের অনলাইনে হয়রানি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে ভুয়া পরিচয়ে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট ও পেজ পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও অডিও তৈরি করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের এই প্রশ্নের পরই এটি নিয়ে জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি তখন বলেন, “কিছুদিন ধরে আমরা লক্ষ্য করছি, বাংলাদেশের সরকারের প্রধান তার স্ত্রী, তার কন্যা, আমার স্ত্রী কন্যা এবং অনেকের স্ত্রী ও কন্যা এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অথবা প্রতিপক্ষ বিবেচনায় যে সমস্ত কন্টেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ভার্চুয়াল মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে। স্বাধীনতার নামে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে যেসব কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, সেটা আসলেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি না, সেটা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা দরকার।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভার্চুয়াল মিডিয়া এবং অনলাইনভিত্তিক সব প্ল্যাটফরমকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘সাইবার স্পেস’-এর নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, সংশোধিত আইনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হবে। একই সাথে এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধান সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ”কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপমানজনক, বিরক্তিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করার জন্য নতুন বিধান আনা হবে”।
সাইবার স্পেসের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চুয়াল মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে আইনি সংস্কারে ড্রাফটে হাত দিয়েছি। আমি জানতাম না আজকে এই প্রশ্নটা এখানে আসবে।’
অপসারণ করা যাবে কন্টেন্ট?
গত কয়েক মাসে বিশেষ করে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের কন্টেন্ট তৈরি ও প্রচার করতে দেখা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলছে, আগের সাইবার সুরক্ষা আইন পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইনে পরিণত হলেও বর্তমান আইনে ভুয়া তথ্য, মানহানিকর কন্টেন্ট ও ছবি তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করলেও তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কোন ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বর্তমান আইনে এ সংক্রান্ত যে ধারাগুলো রয়েছে সেখানে ভুয়া ও মানহানিকর কন্টেন্টের কোন অভিযোগ আসলে সেগুলো নিয়ে আমরা বিটিআরসিতে লিখি। বিটিআরসি সেগুলো ডাউন করে কোন কোন ক্ষেত্রে”।
তার কাছে প্রশ্ন ছিল এই ধরনের কন্টেন্টগুলো কি শুধুই ডাউন করা যায়? নাকি সেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলা যায়? এর জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এ নিয়ে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ মেটার সাথে কোনো ধরনের সমঝোতা বা চুক্তি না থাকার কারণে এ নিয়ে খুব একটা সাড়া দেয় না মেটা কর্তৃপক্ষ। যে কারণে এসব কন্টেন্ট ফেসবুক ইউটিউব থেকে সব সময় সরানোও যায় না।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, “চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, সেক্সটর্শন কিংবা জঙ্গিবাদের মতো বিয়ষগুলো নিয়ে যখন কোন অভিযোগ মেটা কর্তৃপক্ষের কাছে যায় তখন তারা এ সংক্রান্ত কন্টেন্ট অপসারণে গুরুত্ব দেয়। এর বাইরে অন্য কন্টেন্ট নিয়ে খুব একটা সাড়া পাওয়া যায় না”।
সোমবার জাতীয় সংসদে হেলেন জেরিন খান সম্পূরক একটি প্রশ্নে জানতে চান মেটাসহ আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সাথে কার্যকর যোগাযোগে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না? এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের আইনে এখনো এমন বিধান নেই, যার মাধ্যমে মেটাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনটেন্ট সরাতে বাধ্য করা যায়।
তিনি আরও বলেন, “বিটিআরসি বা অন্য কর্তৃপক্ষ মেটাকে অনুরোধ পাঠালেও তারা অনেক সময় দ্রুত ব্যবস্থা নেয় না। তারা বলে, তোমাদের তো আইনটা ঠিকমতো নাই। সুতরাং আইনি কভার না থাকলে সেটা প্রেসার দেওয়া যায় না। নতুন সংশোধনে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সমন্বয়, সময়সীমাভিত্তিক কনটেন্ট অপসারণ এবং রিপোর্ট করা কনটেন্ট অপসারণ প্রক্রিয়া কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার বিধান থাকবে।”