যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তির ঘোষণা এলেও লেবাননে দখল করা এলাকা ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, প্রয়োজন যতদিন থাকবে, ততদিন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননের নিরাপত্তা বেষ্টনী এলাকায় অবস্থান করবে। একই সঙ্গে সিরিয়ায় দখল করা অঞ্চল থেকেও ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (১৫ জুন) এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু এসব মন্তব্য করেন। তিনি জানান, লেবাননে দখল করে রাখা প্রায় ৫৭০ বর্গকিলোমিটার (২২০ বর্গমাইল) এলাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ-এর সঙ্গে ইসরায়েলের চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের নেতানিয়াহু বলেন, ‘যতদিন প্রয়োজন হবে, ততদিন আমরা লেবাননের নিরাপত্তা বেষ্টনী এলাকায় থাকব।’
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষর হতে যাওয়া চুক্তির আওতায় লেবাননের পরিস্থিতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য আগে থেকেই নাজুক অবস্থায় থাকা যুদ্ধবিরতি চুক্তির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
এর আগে গত রোববার চুক্তির ঘোষণা দেয়ার সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছিলেন, সমঝোতা স্মারকে ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করছে ইসরায়েল। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তারা সীমান্ত পেরিয়ে অভিযান শুরু করে, যা পরে পূর্ণমাত্রার লেবানন আগ্রাসনে রূপ নেয়। বর্তমানে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদীর ওপারের এলাকাও দখল করে রেখেছে। অথচ এই নদীকেই ইসরায়েল ঘোষিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চলের’ শেষ সীমা হিসেবে ধরা হয়।
এসবের পরও নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল ‘ইরানের সন্ত্রাসী বাহুগুলোকে’ লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়ে যাবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে হবে।
এর আগে গত রোববার ইসরায়েল বৈরুতের উপকণ্ঠে হামলা চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করে। এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি প্রসঙ্গে ইরানের নির্ধারিত ‘রেড লাইন’ অতিক্রম হিসেবে দেখা হয়।
এই হামলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। তার আশঙ্কা ছিল, এটি যুদ্ধবিরতির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে তেহরানের পাল্টা হামলার হুমকির মধ্যেও রোববার রাতেই চুক্তি-সংশ্লিষ্ট সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা হয়।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় নেতানিয়াহু ইতোমধ্যেই ইসরায়েলের বিরোধী দল ও কট্টরপন্থি মহলের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এ নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গেও তার অন্তরালে মতবিরোধ হয়েছে।
কট্টরপন্থি ইসরায়েলিরা আশঙ্কা করছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান হলে লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানও বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে গাজায়ও ইসরায়েল প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার (৩৮৬ বর্গমাইল) এলাকা দখল করে রেখেছে।
সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, সব বিষয়ে তার সঙ্গে ট্রাম্পের মতের মিল হয় না। তবে তিনি দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সামগ্রিকভাবে ইসরায়েলের জন্য সফল হয়েছে। তার ভাষায়, ‘অনেক ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এক, আবার কিছু ক্ষেত্রে তা এক নয়। ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের দায়িত্ব আমার এবং আমি সেটাই রক্ষা করি।
তিনি আরও বলেন, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না— আজ নয়, আগামীকালও নয়। আমরা দেশটির নেতাদের নির্মূল করেছি, তাদের সন্ত্রাসী কারখানাগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছি।
এর আগে সোমবারই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও ঘোষণা দেন, ২০২৩ সাল থেকে দখল করা কোনও এলাকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরানো হবে না।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আমি লেবানন, সিরিয়া ও গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলে সময়সীমা ছাড়া ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখার সুস্পষ্ট নীতি অনুসরণ করছি। বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের কোনও চাপের মুখেই লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের পক্ষে আমরা নই।