ইউরোপজুড়ে আবারও তীব্র তাপপ্রবাহ

0
2
ইউরোপজুড়ে আবারও তীব্র তাপপ্রবাহ

ইউরোপজুড়ে আবারও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। চলতি বছর মে-জুন মাসেই অনেক দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা জনজীবনে ব্যাপক দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ‘হিট ডোম’ বা ‘তাপ বলয়’ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, চলতি সপ্তাহেও ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর ফলে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন খাত এবং বন্যপ্রাণীও পড়ছে চরম ঝুঁকিতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২১ জুন উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালীন অয়ন বা বছরের দীর্ঘতম দিনের সময় সূর্যালোকের পরিমাণ সর্বাধিক থাকে। এ সময় পৃথিবী সবচেয়ে বেশি সৌরশক্তি গ্রহণ করে, যা তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ বছর সেই পরিস্থিতির সঙ্গে সাহারা মরুভূমি থেকে আসা উষ্ণ বায়ু যুক্ত হয়ে ইউরোপজুড়ে একটি শক্তিশালী তাপ বলয় তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এই হিট ডোম পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের ওপর উষ্ণ বায়ুকে আটকে রাখছে, ফলে দিনের পর দিন তাপমাত্রা বাড়ছে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, গত মে মাসে পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ মে মাসের তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে ফ্রান্সেও মে মাসকে দেশের ইতিহাসের উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অনুভূত তাপমাত্রা বর্তমানে ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে অবস্থান করছে, যা অত্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহের ইঙ্গিত দেয়।

তাপপ্রবাহের কারণে ইতোমধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। স্পেনে মে মাসে তাপজনিত কারণে ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা ২০১৫ সালে পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। ফ্রান্সে সাতজন এবং যুক্তরাজ্যে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

তীব্র গরমের কারণে বিভিন্ন দেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা কয়েকটি অঞ্চলে লাল ও কমলা সতর্কতা জারি করেছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

ফ্রান্সে তাপপ্রবাহের প্রভাবে রেল যোগাযোগ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ায় নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণে ৩ হাজার ৫০০ কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে ৭১টি আন্তঃনগর ট্রেন। প্যারিসের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর কিছু অনুষ্ঠানও স্থগিত করা হয়েছে।

জার্মানির বার্লিন ওপেন টেনিস টুর্নামেন্টের ফাইনাল স্থগিত করা হয়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলে তীব্র বজ্রঝড়ের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বেলজিয়ামের নামুর অঞ্চলে পাখিসহ প্রায় ১৫০টি প্রাণী অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

ইতালির বোলোনিয়া, ফ্লোরেন্স, মিলান ও তুরিনসহ আটটি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবেরই প্রতিফলন।

আবহাওয়াবিদদের মতে, অতীতে জুলাই মাসে যে ধরনের তাপপ্রবাহ দেখা যেত, তা এখন মে ও জুনেই শুরু হচ্ছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক অঞ্চলে স্বাভাবিক জলবায়ুগত গড়ের তুলনায় ১২ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিনে ইউরোপের অনেক দেশে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। কারণ বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে অবস্থান করা তাপ বলয় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

এদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ইউরোপে নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। কপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্যমতে, ২০২৫ সাল ছিল বিশ্ব ও ইউরোপের ইতিহাসে তৃতীয় উষ্ণতম বছর। এর আগে ২০২৪ ও ২০২৩ সালও রেকর্ড উষ্ণ বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত গ্রীষ্মে ইউরোপে আনুমানিক ২৪ হাজার ৪০০ তাপজনিত মৃত্যুর মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষণা অনুযায়ী, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রিস ও সাইপ্রাস সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে এসব দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয় এবং এর ফলে প্রায় ৯৫০ জনের মৃত্যু ঘটে।

আবহাওয়াবিদ ইওয়ানা ভার্জিনি বলেন, “ইউরোপের গ্রীষ্ম শুধু আরও উষ্ণ হচ্ছে না, বরং এর স্থায়িত্বও দুই প্রান্তে দীর্ঘ হচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ইউরোপে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here