যেসব খাতে কর কমানোর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

0
1
যেসব খাতে কর কমানোর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জনমনে সমালোচনার জন্ম দেওয়া কালো টাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত বিধানটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো, ব্যাংক হিসাব খোলা ও সম্পত্তি নিবন্ধনে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার কমানো, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর করসুবিধা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর হ্রাসসহ একগুচ্ছ প্রস্তাব তুলে ধরেন।

সোমবার (২৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৮তম কার্যদিবসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব প্রস্তাব দেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সকালে অধিবেশন শুরু হয়। প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বাজেটের ওপর বক্তব্য দেন। পরে সংসদ নেতা হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের দাবি বিরোধী দল থেকে আসে। আমি আপাতত শারীরিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু কথা বলতে চাই।’

করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব

করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত আয়করের করমুক্ত সীমা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এ সীমা যথাক্রমে ৪ লাখ, সাড়ে ৪ লাখ এবং ৫ লাখ টাকা করার সুপারিশ করেন।

কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহারের আহ্বান

স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমি প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধন না হওয়ায় করদাতাদের হয়রানি কমানোর উদ্দেশ্যে এ বিধান আনা হয়েছিল।

তবে অনেকেই এটিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন উল্লেখ করে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর প্রতি এ বিধান প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহারের সুপারিশ

ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন এবং সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। এ কারণে তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমানোর প্রস্তাব

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে তিনি বলেন, কর-সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন করতে হবে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।

এ সময় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে প্রস্তাবকে স্বাগত জানান।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর করসুবিধা সম্প্রসারণ

পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য করমুক্ত সুবিধা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বর্তমানে পার্বত্য জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিদের বেতন ও আর্থিক সম্পদ থেকে অর্জিত আয় ছাড়াও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আয় করমুক্ত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এ সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করে ব্যবসা, কৃষি এবং বেতনের আয়ও করমুক্ত করার অনুরোধ জানান তিনি। একই সুবিধা সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করার সুপারিশ করেন।

শিল্প খাতে শুল্ক-কর কমানোর সুপারিশ

চিংড়ি শিল্পের প্রসার ও রপ্তানি বাড়াতে ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেলস এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

এ ছাড়া স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেন। ওষুধ ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত মধু আমদানির ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং পিইটি রেজিন, পিভিসি, কোল্ড-রোলড শিট, রোল প্রোডাক্টের অক্সাইডসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনে ব্যবহৃত কপার আমদানির ওপর ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানিতে প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করেন তিনি।

এছাড়া স্থানীয়ভাবে এলইডি ল্যাম্প ও প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড বিল্ডিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধার মেয়াদ ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।

ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অনেক ব্যবসায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিজ্ঞাপন দেন। কিন্তু এসব সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট থাকায় অনেকে আনুষ্ঠানিক পদ্ধতির বাইরে অর্থ পরিশোধ করেন। এতে সরকার রাজস্ব হারায়।

তিনি এ খাতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার আহ্বান জানান, যাতে ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত হন।

এছাড়াও আরও কয়েকটি খাতে প্রধানমন্ত্রী ভ্যাট কমানোর সুপারিশ করেন। খাতগুলো হচ্ছে স্বর্ণ, প্লাটিনাম, হীরা ও রূপার অলঙ্কারের ওপর বিদ্যমান কর ও ভ্যাট পুনর্নির্ধারণ, টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিটিআরসির রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, সব ধরনের মাঠ সরবরাহে সরবরাহকারী পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি এবং স্থানীয়ভাবে ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here