এটি শুধু একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল নয়। এটি যেন ফুটবলের দুই ভিন্ন দর্শনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প। এক পাশে আবেগ, লড়াই আর অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার অভ্যাস। অন্য পাশে শৃঙ্খলা, ছন্দ, বলের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ আর পরিকল্পিত সৌন্দর্য। সেই দুই ধারার প্রতিনিধিত্ব করেই আজ নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফির জন্য মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন।
এই লড়াই হওয়ার কথা ছিল আরও আগেই। দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপসেরা স্পেনকে ফিনালিস্সিমায় দেখার অপেক্ষায় ছিল ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে সেই ম্যাচ আর মাঠে গড়ায়নি। কয়েক মাসের অপেক্ষার পর এবার তার চেয়েও বড় মঞ্চে, বিশ্বকাপের ফাইনালে, পূরণ হতে যাচ্ছে সেই প্রতীক্ষা!
আর্জেন্টিনার এই যাত্রা ছিল মোটেও সহজ নয়। বর্তমান দলে ২০২২ সালের বিশ্বজয়ী স্কোয়াডের ১৭ জন থাকলেও তাদের প্রতিটি ধাপ পেরোতে হয়েছে প্রবল চাপের মধ্যে। অতিরিক্ত সময়ে গড়া কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে লড়াই, মিশরের বিপক্ষে হারের শঙ্কা কাটিয়ে ফেরা, এরপর সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্নায়ুক্ষয়ী নকআউট-প্রতিটি ম্যাচ যেন ছিল টিকে থাকার পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় বারবার পথ দেখিয়েছেন লিওনেল মেসি। কখনো গোল, কখনো অ্যাসিস্ট, কখনো কিংবা মুহূর্তের জাদুতে দলকে টেনে তুলেছেন তিনি!
অন্যদিকে স্পেনের গল্পটি ভিন্ন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল পুরো টুর্নামেন্টেই ছিল শান্ত, পরিমিত এবং হিসাবি। বলের নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত পাস আর পজিশনাল ফুটবলে প্রতিপক্ষকে প্রায় দম বন্ধ করে দেওয়ার মতো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে তারা। ইউরো জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে এবারও নিজেদের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী হিসেবে প্রমাণ করেছে স্পেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ২-০ গোলের জয় ছিল সেই পরিণত ফুটবলের আরেকটি উদাহরণ।
এই ফাইনালে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিগত লড়াই অবশ্য লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামালকে ঘিরে। একজনের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের আলো, অন্যজনের শুরুটা যেন বিস্ময়ে মোড়া। বার্সেলোনার লা মাজিয়া থেকে উঠে আসা দুই প্রজন্মের দুই প্রতীক এবার মুখোমুখি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
ফাইনালের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও ভাইরাল হয়েছে বহু বছর আগের সেই ছবি, যেখানে শিশু ইয়ামালকে কোলে নিয়ে গোসল করাচ্ছেন তরুণ মেসি। সেই ছবিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা গল্প, নানা কল্পনা। কেউ বলছেন প্রতিভার উত্তরাধিকার, আবার ইয়ামালের বাবার রসিকতা-হয়তো উল্টোটা হয়েছিল আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ডাগআউটেও রয়েছে অন্যরকম গল্প। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি যখন স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচিং কোর্স করেছিলেন, তখন তার প্রশিক্ষকদের একজন ছিলেন বর্তমান স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। সেই সম্পর্ক এবার রূপ নিচ্ছে গুরু-শিষ্যের কৌশলগত লড়াইয়ে!
তবে স্পেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে মাঠের অবস্থা। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের পিচ নিয়ে পুরো টুর্নামেন্টেই প্রশ্ন তুলেছেন খেলোয়াড় ও কোচরা। বলের নিয়ন্ত্রণনির্ভর স্প্যানিশ ফুটবলের জন্য এই মাঠ আদর্শ নয়। সেক্ষেত্রে ম্যাচ যদি ছন্দ হারায়, তাহলে সেটি আর্জেন্টিনার জন্য সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, নকআউট পর্বে বারবার প্রতিকূল পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে ঘুরিয়ে আনার অভিজ্ঞতা রয়েছে স্কালোনির দলের।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা। প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, খোলা আকাশের নিচে ম্যাচ, কানাডার দাবানলের ধোঁয়ার প্রভাব এবং ৮০ হাজারের বেশি দর্শকের উপস্থিতি-সব মিলিয়ে ফাইনালটি শারীরিকভাবেও কঠিন পরীক্ষার নাম হতে পারে।
স্পেন চাইবে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে। আর আর্জেন্টিনা খুঁজবে সেই পরিচিত নাটকীয়তার পথ, যেখান থেকে তারা এই টুর্নামেন্টে বারবার ফিরে এসেছে।
সবশেষে আলোটা এসে পড়ে একজনের ওপরই। আর্জেন্টিনার প্রতিটি পরিকল্পনার কেন্দ্র লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও যিনি বয়সকে কেবল একটি সংখ্যা বানিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের শিল্প ছড়িয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে মাত্র ১৯ বছর বয়সী ইয়ামালের সামনে সুযোগ, প্রথম বিশ্বকাপেই নিজের নাম লিখিয়ে দেওয়ার।
তাই এই ফাইনালকে যুদ্ধের ভাষায় ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। এখানে রণহুঙ্কারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে পায়ের কারুকাজ, পাসের সুর আর কৌশলের সৌন্দর্য। কারণ বিশ্বকাপের শেষ রাতটি হতে চলেছে দুই ফুটবল শিল্পীর দলের এক অনন্য শিল্পযুদ্ধ।
ফাইনাল
স্পেন-আর্জেন্টিনা: সরাসরি, রাত ১টা, বিটিভি, টি স্পোর্টস ও সময় টিভি