সিকিমের নামচি জেলায় তিস্তা স্টেজ-VI জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০-তে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন পাঁচ জন। উদ্ধারকারী দলগুলি নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে গেলেও সুড়ঙ্গের ভিতরে মিথেন গ্যাসের তীব্রতা, ক্রমাগত ধসের আশঙ্কা ও সংকীর্ণ স্থান উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।
সোমবার দুপুরে নামচি জেলার সামারদুং এলাকায় এনএইচপিসি-র এই প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আচমকা ধস নামে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের জেরে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসস্তূপে আটকে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ভিতরে আটকে পড়েন বহু শ্রমিক ও প্রকল্পের কর্মী। প্রাথমিকভাবে উদ্ধারকারী দল ১৬ জনকে উদ্ধার করলেও পরে জানা যায়, যে অংশে ধস নেমেছে তার উল্টো দিকে আরও ২৭ জন কর্মী আটকে রয়েছেন। দু’জন কোনওক্রমে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। বাকি পাঁচজনের খোঁজে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সিকিম প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতদের মধ্যে ১৩ জনকে শনাক্ত করা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে নয় জন জলপাইগুড়ি জেলার মেটেলি ও বিন্নাগুড়ি এলাকার বাসিন্দা, দু’জন আলিপুরদুয়ারের, একজন পাঞ্জাবের এবং একজন সিকিমের। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন কেরালার ভূতত্ত্ববিদ অনীশ মোহন (৪৩)।
উদ্ধারকাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুড়ঙ্গের ভিতরে জমে থাকা মিথেন গ্যাস। প্রশাসনের এক সূত্রের দাবি, এই মিথেন গ্যাসে আচমকা বিস্ফোরণ হয় এবং তার কারণেই ধস নামে। উদ্ধারকারী দল ধস পেরিয়ে টানেলের ভিতরে ঢুকতে গেলে অনেকেই মিথেন গ্যাসের তীব্রতায় অসুস্থ বোধ করেন এবং কয়েকজন জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন। পাশাপাশি সুড়ঙ্গের ভিতরে পুনরায় ধস নামার আশঙ্কা, পাথর ও কাদার স্তূপ এবং সংকীর্ণ জায়গা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধাপে ধাপে ধ্বংসস্তূপ সরানো হচ্ছে, যার ফলে অভিযান সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), সেনাবাহিনী, রাজ্য পুলিশ, দমকল এবং এনএইচপিসি-র বিশেষজ্ঞ দল যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার সুজাতা কুমারী বীণাপানি জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির লোকজনদের দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখছেন এবং প্রশাসনের সব বিভাগকে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি মৃতদের প্রত্যেক পরিবারকে ৪ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজ নেন এবং কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছেন।
এনএইচপিসি জানিয়েছে, আটকে পড়া কর্মীদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে এবং দুর্ঘটনার কারণ জানতে বিস্তারিত তদন্ত শুরু হবে। সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী এই সুড়ঙ্গ ধসের কারণ খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীতে সিল্কিয়ারা-বারকোট সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ে আটকে পড়া ৪১ জন শ্রমিককে ৪০০ ঘণ্টার দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের পরে সম্পূর্ণ নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। সিকিমের এই বিপর্যয়েও প্রশাসন আশাবাদী যে নিখোঁজ পাঁচ জনের সন্ধানে চলা অভিযান যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা যাবে। তবে উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, পাহাড়ি এলাকার প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং ধসের ঝুঁকির কারণে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে।