ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আজহাতেও টানা ছুটির ফাঁদে পড়েছে দেশ। এই দীর্ঘ ছুটি সরকারি চাকরিজীবী ও তাদের পরিবারের জন্য ঈদ আনন্দের মাত্রা বাড়ালেও, কিছু ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলে যাওয়ায় পর্যটনের পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে আবহাওয়া কিছুটা বৈরী হলেও ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পরিবেশ। বিকেলে পর থেকেই লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
পর্যটক আকর্ষণে এবার কক্সবাজারে প্রথমবারের মতো তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসে সপ্তাহব্যাপী ‘ফ্রেশ ফ্রুটস ফ্যাস্টিভাল’ আয়োজন করা হয়েছে। ফল দিয়ে উপস্থাপিত বাহারি রসনা সাশ্রয়ী দামে উপভোগ করছেন পর্যটকরা। তবে ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার মোস্তফা জানান, অতীতের মতো এবার আশানুরূপ আগাম বুকিং হয়নি। ওশান প্যারাডাইসের বিপণন প্রধান ইমতিয়াজ নূর সোমেল জানান, বৈরী আবহাওয়া ও ছুটির বিন্যাসের কারণে গড়ে ৪০ শতাংশ রুম বুকিং পাওয়া গেছে। হোটেল-গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, টানা ছুটি হলেও পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কম, তবে ঈদের দিনগুলোতে লাখো পর্যটকের সমাগম ঘটার আশা রয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় কক্সবাজার রিজিয়নের ট্যুরিস্ট পুলিশ ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে। সি সেইফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার মুহাম্মদ ওসমান জানান, গোসলরত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে লাইফগার্ড কর্মীরা সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
কক্সবাজারের মূল সৈকতের বাইরেও পর্যটকদের জন্য রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপে রয়েছে দীর্ঘ জেটি, যেখান থেকে মিয়ানমারের মংডু অঞ্চল ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। ঢাকা থেকে বাসযোগে বা কক্সবাজার হয়ে এখানে সহজেই পৌঁছানো সম্ভব। মেরিন ড্রাইভ ধরে ৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে শতবর্ষী জাহাজপুরা গর্জন ফরেস্ট, যেখানে প্রকৃতির শীতল ছোঁয়া পাওয়া যায়। রামুর রশিদনগর পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ‘স্বপ্নতরী পার্ক’ নতুন বিনোদন স্পট হিসেবে পর্যটকদের নজর কেড়েছে, যেখানে সিএনজিতে করে খুব সহজে যাওয়া যায়।
চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নে অবস্থিত ‘নিভৃতে নিসর্গ পার্ক’ এখন পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ। মাতামুহুরী নদী ও পাহাড়ঘেরা এই পার্কে কায়াকিং ও নৌকায় ঘোরার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রথম সাফারি পার্ক ডুলাহাজারা এবং রামুর ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দির ও জাদিগুলোও পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। রামুর উত্তর মিঠাছড়িতে অবস্থিত গৌতম বুদ্ধের ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যের সিংহশয্যা মূর্তি এবং সীমা বিহার পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দেয়।
মহেশখালীর মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক আদিনাথ মন্দির ও সোনাদিয়া দ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন। সোনাদিয়া দ্বীপে লাল কাঁকড়া, ম্যানগ্রোভ বন ও ক্যাম্পিংয়ের সুবিধা থাকায় এটি ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের শীর্ষে। এছাড়া কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কটি নিজে এক অনন্য পর্যটন আকর্ষণ। টেকনাফের নাফ নদীর তীরের ঐতিহাসিক মাথিনের কূপ এবং টেকনাফ ন্যাচার পার্কও পর্যটকদের কাছে দারুণ দর্শনীয়।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে সরকারিভাবে আরও পরিচর্যা করা হলে এবং নতুন দর্শনীয় স্থানগুলোর প্রচারণা বাড়ালে সারা বছরই পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকবে এই জেলা। প্রকৃতি ও বৈচিত্র্যময় পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে কক্সবাজার হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্য।