জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে দেশের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১৮০ দিন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। ইতোমধ্যে সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে সরকার। বিশেষ করে নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচির আলোকে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছে।
বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের করা লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’ এই দর্শনকে সামনে রেখে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে নারীপ্রধান পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এর মাধ্যমে মাসিক ২,৫০০ টাকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাইলটিং পর্যায়ে এ পর্যন্ত ৩৬টি ইউনিটের ৬০,০৪৮টি পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকদের ইউনিক পরিচয় নিশ্চিতকরণে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা এবং স্বল্প মূল্যে সেচ সুবিধাসহ সহজ শর্তে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রদানের লক্ষ্যে গত ১৪ এপ্রিল কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে দেশের ৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে এ কার্যক্রম চলছে এবং এ পর্যন্ত ২০,৭৪৮ জনকে কৃষক কার্ড প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে ১৫৬৭.৯৬ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করেছে, যার ফলে সারা দেশের প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ জন কৃষক উপকৃত হবেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় দেশের ৪৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির, ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহার বা প্যাগোডা এবং ৩৯৬টি গির্জায় কর্মরত ব্যক্তিদের মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এই সুবিধা দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় জনগণকে ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে ৫টি জেলা তথা খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদীর জনসাধারণকে ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হবে। এই কার্ডটি ইলেকট্রনিক পেশেন্ট রেফারেল সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত থাকবে।
পরিবেশ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গত ১৬ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে। ৩১ মে পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ৬৬৬টি খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য ১৬৩৫.০৪ কিলোমিটার। এছাড়া ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বনায়ন সৃজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৩ কোটি ১৪ লাখ চারা রোপণ করা হবে, যা স্থানীয় সরকার ও এনজিওদের সাথে সমন্বয় করে সম্পন্ন করা হবে।
সরকারপ্রধান আরও বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে আগামী অর্থবছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মধ্যে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুলে পর্যায়ক্রমে “ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব” পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ আধুনিকায়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের ২৩৩৬টি কারিগরি ও ৮২৩২টি মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘ফ্রি ওয়াই-ফাই’ চালু করা হবে। তরুণদের উচ্চশিক্ষার সুবিধার্থে ল্যাঙ্গুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণ সীমা ৩ লক্ষ টাকা হতে ১০ লক্ষ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। বিশেষ করে জাপানগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির পূর্বেই সার্টিফিকেট অব এলিজিবিলিটি এর ভিত্তিতে এই ঋণ দেওয়া সহজীকরণ করা হয়েছে।
এছাড়া দেশের ক্রীড়া ও বিনোদন খাতের উন্নয়নে সারা দেশে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গঠিত কমিটি কাজ করছে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় যথাক্রমে ৮ বিঘা ও ১০ বিঘা করে উন্মুক্ত খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্রীড়া ভাতা চালু করা হয়েছে, যেখানে প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে আওতায় আনার পরিকল্পনার মধ্যে এ পর্যন্ত ৩০০ জনকে ভাতা এবং ৩২৫ জনকে ক্রীড়া কার্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ১২-১৪ বছরের শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত ২ মে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে, যাতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, অ্যাথলেটিকস, ব্যাডমিন্টন, দাবা, সাঁতার ও মার্শাল আর্টসহ মোট ৮টি খেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে হাই-টেক বা সফটওয়্যার পার্ক ও আইসিটি সেন্টারসমূহ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে পেপ্যাল এর কার্যক্রম আরম্ভে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের টেকসই উন্নয়নে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ও নেট মিটারিং এর মাধ্যমে মোট ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে শুধুমাত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অধীনস্থ দপ্তর ও সংস্থাসমূহে শূন্য পদের বিপরীতে ২৮৭৯ জন লোক নিয়োগের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।