‘ন্যায় ব্যর্থ হলে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রও ভেঙে পড়ে’:  প্রধান বিচারপতি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ: সংবিধানসম্মত শক্তিশালী বিচার বিভাগ গড়তে হবে

0
36

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, “আইন কেবল নিয়মের সমষ্টি নয়, এটি জাতির নৈতিক বিবেকের প্রতিফলন। ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র দৃঢ় হয়, আর ন্যায় ব্যর্থ হলে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রও ভেঙে পড়ে।” তিনি বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একটি প্রশাসনিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সাংবিধানিকভাবে শক্তিশালী বিচার বিভাগ বিনির্মাণের ওপর জোর দেন।

শনিবার (২৫ অক্টোবর) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আইন বিভাগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে মানবাধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “মানবতা যখন অবিচার ও অমানবিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভয়াবহ পরিণতি প্রত্যক্ষ করে, তখনই মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা মানবজাতিকে নতুন এক নৈতিক চেতনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যখন রাষ্ট্র নাগরিকদের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাদের কণ্ঠরোধ করে, তখন ন্যায়ের জন্য লড়াই করা নৈতিকভাবে অপরিহার্য হয়ে পড়ে।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, “১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার জন্য ছিল না, এটি ছিল ন্যায়, মর্যাদা ও অস্তিত্বের অধিকারের সংগ্রাম। ঠিক একইভাবে ১৯৭১ সালে বাঙালি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য নয়; বরং মর্যাদা, সমতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য লড়েছিল।”

বিচার বিভাগ সংস্কার নিয়ে ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, “আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রশাসনিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ, নৈতিকভাবে সাহসী ও সংবিধানিকভাবে শক্তিশালী বিচার বিভাগ বিনির্মাণ করতে হবে।”

তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিচার বিভাগ সংস্কারের একটি ‘রোডম্যাপ’ ঘোষণা করেছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হলো পৃথক সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, ‘সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বিগত ১৫ মাসের সুপরিকল্পিত কৌশলগত প্রচেষ্টা ও বহুপাক্ষিক প্রয়াসের ফল।

সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উদ্দেশ্যে সতর্কবার্তা দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, “কোনো ধরনের অবিশ্বাস বা একতরফা আচরণ গত ১৫ মাসের নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার এই ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিচার বিভাগীয় স্বায়ত্তশাসনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সব অংশীজনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমন্বয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।”

আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও আইনের নবীন স্নাতকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আইনের অধ্যয়ন কেবল পেশাগত প্রশিক্ষণ নয়, এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সাধনা। প্রত্যেক আইনের পেছনে আছে একটি জীবন, প্রত্যেক রায়ের পেছনে আছে একটি ভাগ্য।”

প্রযুক্তিনির্ভর বিচার ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা এখনো ঔপনিবেশিক কাঠামোর উত্তরাধিকার বহন করছি। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা-নির্ভর ব্যবস্থাপনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হবে।”

বক্তব্যের শেষাংশে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, “ন্যায়বিচারের পুনর্জাগরণ এখন আমাদের সময়ের আহ্বান। সংবিধানের স্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার যেন দেশের প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়—সেটিই আমাদের দায়িত্ব।”

রাবির আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. সাঈদা আঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি এসএসহ অন্যান্য বিচারপতি, রাবির উপাচার্য ড. সালেহ হাসান নকিব, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন খান এবং উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।