বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও বেইজিংয়ের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার প্রথম বিদেশ সফরের অংশ (দ্বিতীয় গন্তব্য)। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হাই-প্রোফাইল সফরটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস’-এ প্রকাশিত সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের দক্ষিণ এশিয়া স্টাডিজ কেন্দ্রের পরিচালক লিউ জোংই-এর এক মতামত নিবন্ধে এই সফরের বহুমাত্রিক তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্কের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ ও চীন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার নীতি বজায় রেখেছে। ২০২৪ সালে দুই দেশের সম্পর্ক ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্বে’ রূপ নেয়।
বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব: টানা ১৫ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার। তাছাড়া, বাংলাদেশি পণ্যে বেইজিংয়ের দেওয়া শূন্য শুল্ক সুবিধা এই বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করেছে।
মেগা প্রকল্প ও কানেক্টিভিটি: পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ অবকাঠামো এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
সমঝোতা স্মারক: প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে শিল্প, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংক্রান্ত ১৫টিরও বেশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
গ্লোবাল টাইমসের নিবন্ধে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও মজবুত করার ক্ষেত্রে তিনটি মূল চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে:
ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা: পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক টানাটানি এবং ‘ঋণের ফাঁদ’ তত্ত্বের মতো প্রোপাগান্ডা ব্যবহার করে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা।
নীতির ধারাবাহিকতা: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি: পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং মার্কিন বা পশ্চিমা দেশগুলোর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে দেশের সুশীল ও অভিজাত মহলের একাংশের উদ্বেগ।
এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের আরও দূরদর্শিতা এবং সাহসের সাথে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (বাংলাদেশ প্রথম) নীতি অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিবন্ধটিতে সহযোগিতার ৩টি ভবিষ্যৎ ক্ষেত্রও উন্মোচন করা হয়েছে:
শিল্প স্থানান্তর ও উৎপাদন: চীনের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো বাংলাদেশে স্থানান্তরের মাধ্যমে কম শ্রমব্যয়ের সুবিধা নিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা।
আঞ্চলিক ও গ্লোবাল সাউথ কো-অপারেশন: চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো এবং বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এশিয়ার শিল্প শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দৃঢ় করা।
সুশাসন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়: থিংক ট্যাংক ও রাজনৈতিক পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজস্ব বাস্তবতার নিরিখে আধুনিকায়নের পথ খুঁজে নেওয়া।
মূল বক্তব্য: উন্নয়নের কোনো একক বৈশ্বিক মডেল নেই। পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নিজস্ব আধুনিকায়নের পথ অনুসরণ করার মতো সক্ষমতা ও সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। আর এই যাত্রায় বেইজিং একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হতে পারে।